• ২৮ আগস্ট ২০১৮ ১৪:৫০:১৬
  • ২৮ আগস্ট ২০১৮ ১৪:৫০:১৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

এক অসহায় যুবকের মোটরবাইক চুরি ও একটি চোর পুলিশ খেলা!

কাউনিয়া থানা। ছবি : সংগৃহীত


নজরুল বিশ্বাস :


ঈদের সপ্তাহ খানেক আগের কথা। ভোরবেলা আমার ঘরের সামনে কান্নার শব্দ। আমি ঘুম থেকে জেগে সামনের বারান্দায় এলাম। দেখি একজন যুবক তার স্ত্রীকে সাথে নিয়ে ঘরের দরজার সামনে বসে কেঁদে কেঁদে বলছেন আমার একমাত্র আয়ের পথছিল তাও এখন বন্ধ হয়ে গেল। জানতে চাইলাম কি হয়েছে? কোন এলাকা থেকে এসেছেন? আর কেনই বা কান্নাকাটি করছেন?

উত্তরে তিনি আমাকে জানালো তার নাম মনির। সে থাকে আমার বাড়ির সামনেই, বরিশাল নগরীর উলাল গনি (মহাবাজ) এলাকায়। একটি ভাড়া বাসায় থাকেন স্বামী-স্ত্রী। শ্বশুর বাড়ির লোকজনদের কাছ থেকে টাকা ধার এনে একটি মোটরবাইক কিনেছেন। বাইকটি চালিয়ে তিনি রোজগার করেন। কোনো রকম স্ত্রী, সন্তান নিয়ে বেঁচে আছেন।

এই মোটরবাইকের মাধ্যমেই যে আয় হয় তা দিয়েই থাকা খাওয়ার পাশাপাশি ধার শোধ করার তাড়া আছে। বেধে দেয়া সময়ের মধ্যে ধারের টাকা শোধ করতে না পারলে সুধের টাকা দিতে হবে। কিন্তু সেই বাইকটি চোর নিয়ে পালিয়েছে। মনির আমাকে বললো, ‘দাদা এলাকার সবাই আপনার কাছে আসতে বলছে।’ এই এলাকায় আমার বেড়ে ওঠা এবং এই শহরের সাংবাদিকতার সূত্রে অনেক মানুষের সাথে পরিচয় আছে। সেই সূত্রেই হয়তো মনির সাহায্য চাইতে এসেছিলো।

আমি তার কাছ থেকে আবার জানলাম কিভাবে মোটরবাইকটি চোরে নিল। মনির পুরো ঘটনা খুলে বললো। জানলাম যে চোর তার বাইকটি নিয়ে পালিয়েছে সে আমাদেরই এলাকার গোলাম মোস্তফা নামে এক ব্যক্তির পরিচিতজন। মনিরের মোটরবাইকে যাত্রী বানিয়ে উঠিয়ে দিয়েছে সে। পথে মনির বাইক থেকে নামে ব্যক্তিগত কাজ সারার জন্য। এই ফাকে বাইকটি নিয়ে পালায় চোর। আমি তাকে থানায় অভিযোগ করতে বলি। সেই সাথে কাউনিয়া থানার এস আই জসিমকে ফোন করে অনুরোধ করি তাকে সহযোগিতা করতে। মনির থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ করলেন।

বিষয়টি ওসি (ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) সাহেব অবগত হলেন। দারোগা এসে মোস্তফাকে জানিয়ে গেলেন তিনি যেন থানায় যান। আমাকে জসিম দারোগা ফোন করে জানালেন ভাই ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। চুরির সাথে মোস্তফা জড়িত। স্থানীয় দোকানদার লালন স্বাক্ষী দিয়েছে। ওকে অচিরেই গ্রেপ্তার করা হবে।

ঈদের আগেই হঠাৎ এক রাতে ফোন করে জসিম দারোগা আবার আমাকে ফোন করে জানালেন মনিরের বাইকটি পাওয়া গেছে। মনিরকে যেন থানায় পাঠিয়ে দেই। আমি মনিরকে থানায় যেতে বললাম। মনির গভীর রাত অবধি থানায় কাটিয়ে তার বাইকটি ফেরত পেলেন না। পুলিশ নাকি জানিয়েছে চোর, কোতয়ালী থানা সংলগ্ন এ এস পি অফিসের সামনের এক চায়ের দোকানদারের কাছ থেকে ২৫ হাজার টাকা নিয়ে বাইকটি রেখে পালিয়েছে। বাইকটি এখন কোতয়ালী থানায়। জসিম দারোগা আবার আমাকে ফোন করে জানালেন, এসপি স্যার মোস্তফাকে গ্রেপ্তার করতে বলছে। মনির বাইক পাবে টেনশান নিয়েন না।

তবে তাকে যেন মনির ‘খুশি করে’। এরই মধ্যে মনিরের কান্না থামছে না। আমি মহা বিপাকে। সারাদিন কাজ শেষে যখন বাসায় ফিরি গভীর রাতে দেখি আমার ঘরের সামনে ‍টুলের উপর বসে মনির কাঁদছে। বলে- দাদা আমাকে বাঁচান। আমি বার বারই দারোগা জসিমকে অনুরোধ করি মনিরের বিষয়টি সুরাহা করতে। কারণ মনিরের রুটি রুজির বিষয়টি নিয়ে এলাকার অনেক মানুষই আমাকে সহযোগিতা করার অনুরোধ করে। আমি বিষয়টি সরাসরি কাউনীয়া থানার ওসি আনোয়ারকে জানালাম এবং অনুরোধ করলাম বিষয়টি তিনি যেন গুরুত্বের সাথে দেখে। তিনিও আমাকে আশ্বস্ত করলেন। আমিও বিশ্বাস রাখলাম। কারণ ওসি আনোয়ারকে অনেকেই ভালো মানুষ বলে জানে। এরই মধ্যে প্রকাশ্যেই মোস্তফার চলাফেরা। মনিরকে বার বার হুমকি থানায় কেন তার নামে অভিযোগ। জসিম দারোগা মোস্তফাকে ধরতে নাকি অভিযান চালান। এর ফাঁকে আমাকে আবার ফোন করে জসিম দারোগা জানালেন, এসপি আতিক স্যার তাকে ফোন দিয়েছে মনিরের বিষয়টি মানবিক দিক চিন্তা করে যেন সুরাহা করে দেন। 

ঘটনার প্রায় ১৫ দিন। চুরি যাওয়া বাইক, দুই এসপির ফোন আর থানা পুলিশের চোর পুলিশ খেলা। মনির অবশেষে গতরাতে জানালো দাদা আমি ওসিকে বলে আসছি আমার বাইকটি না পেলে আত্নহত্যা ছাড়া কোন উপায়ই আর থাকবে না। আমরা কোন দেশে বাস করি। আমরা এমনই স্বাধীন দেশে বাস করি। এই শোকের মাসে আমার এখন বারবারই মনে পরে সেই গানটির কথা। যদি রাত পোহালে শোনা যেত বঙ্গবন্ধু মরে নাই।

লেখক: সভাপতি, বরিশাল রিপোর্টার্স ইউনিটি।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1634 seconds.