• ১০ আগস্ট ২০১৮ ১৬:৪১:৫৮
  • ১০ আগস্ট ২০১৮ ১৬:৪১:৫৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

‘খবরের দিকে আকর্ষণ তৈরি করেছিল আমার বাবা’

সাদিক ইভান। ছবি : সংগৃহীত

আমিনুর রহমান হৃদয় :

‘খবরের প্রতি আকর্ষণ তৈরি করেছিল আমার বাবা। আব্বু চাইতো, নিয়মিত যেন পত্রিকা পড়ি আমি। রাতে বাসায় ফিরে আব্বু আমাকে সঙ্গে নিয়ে টিভিতে খবর দেখতো। এভাবেই ধীরে ধীরে আকর্ষণ তৈরি হয়। কার্টুন দেখার বয়সেই সংবাদ জিনিসটার প্রতি এক ধরণের দুর্বলতা তৈরি হয় আমার।’ বলছিলেন ১৯ বছর বয়সী সাদিক ইভান।

তার জন্ম ঢাকায়। তবে বেড়ে উঠা গাজীপুরে। যৌথ পরিবারে অনেক ভাইবোন আর পারিবারিক বন্ধনে কেটেছে তার শৈশব। লেখালেখির অভ্যাসটা সেই ছোট থেকেই। গণমাধ্যমে সংবাদ নিয়ে কাজ করে এরই মধ্যে পেয়েছেন মীনা মিডিয়া এ্যাওয়ার্ড সহ বেশকিছু পুরস্কার। সম্প্রতি এই প্রতিবেদকের সাথে কথা হয় তার।

কথায় কথায় জানালেন, গণমাধ্যমের সঙ্গে যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৪ সালে দৈনিক ইত্তেফাকের হাত ধরে। ইত্তেফাকের কঁচিকাচার আসরে লিখতেন তিনি। ডাক যোগে লেখা পাঠাতেন। আর সেই লেখা পত্রিকায় ছাপা হলে অনেক ভালো লাগত তার।

সাদিক ইভান বলেন, ‘বছরখানেক পর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে একটা বিজ্ঞাপন দেখি যে, হ্যালো নামে তাদের একটি বিভাগ রয়েছে। যেখানে শিশুরা সাংবাদিকতার সুযোগ পাবে। ওটা দেখে আমি আর সময় নষ্ট করিনি। ভাবছিলাম এতো বড় সুযোগ মিস করলে জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল করা হবে। চটপট করে নিয়ম অনুসরণ করে। আমার সব তথ্য সাবমিট করে নিবন্ধন করে ফেলি। এরপর কাজ করার অনুমতি পাই।’

তিনি আরো বলেন, ‘২০০৯ সাল থেকেই এই পত্রিকাটিকে আমি চিনি। কারণ আব্বুকে দেখতাম ইন্টারনেটে এর খবর পড়ত। আব্বুই আমাকে চিনিয়ে দিয়েছিল যে বিডিনিউজ হলো বাংলাদেশের প্রথম ইন্টারনেট সংবাদপত্র। তাই বিডিনিউজের প্রতি অন্যরকম একটা ভালোবাসা কাজ করত। যেদিন আমার প্রথম লেখা প্রকাশিত হলো, সেদিন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না যে বাংলাদেশের এত জনপ্রিয় একটি সংবাদ মাধ্যমে আমার লেখা প্রকাশ হয়েছে।’

বিডি নিউজে ৩ বছর কাজ করার কথা জানিয়ে ইভান বলেন, ‘এখানে শুধু সাংবাদিকতা শিখিনি। শিখেছি নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা। পেয়েছি একটা পরিবার। জীবনের চলার পথ মসৃণ করা যত শিক্ষা প্রয়োজন সব পেয়েছি বিডিনিউজ থেকে।’

‘এরপর যুক্ত হয়েছিলাম রেডিওতে। এশিয়ান রেডিও ৯০.৮ এফএম সেই সুযোগ দিয়েছিল। সাংবাদিক হিসেবেই তারা চিনত আমাকে। একদিন একটা শিশুতোষ অনুষ্ঠান উপস্থাপনার প্রস্তাব দেয় এশিয়ান রেডিও। বিনা পয়সায় গ্রুমিং করায় আমাকে। তারা রেডিওতে শিশুতোষ সংবাদ প্রতিবেদন প্রচার করার সুযোগও দিয়েছিল আমাকে। তাদের এই আন্তরিকতার নামও ধরে রাখতে পেরেছিলাম। স্বল্প সময়ে রেডিও ক্যারিয়ারে, রেডিও বিভাগে পুরষ্কারও জিতে এনেছিলাম।’

শুধু পত্রিকা বা রেডিও নয়। অল্প বয়সেই এই তরুণ কাজ করেছেন টেলিভিশনেও। বিদেশী সংস্থা ফ্রি প্রেস আনলিমিটেডের অর্থায়নে নির্মিত শিশুদের মতামত ও সংবাদ ভিত্তিক অুনষ্ঠান কানেস্তারার সঙ্গে শুরু হয় তার পথচলা।

শিক্ষাজীবনের গল্পটা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘গাজীপুরের শ্রীপুরে আলনূর প্রি ক্যাডেট স্কুলে আমার প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা শুরু হয়। এরপর চতুর্থ শ্রেণীতে এসে ভর্তি হই ৩২ নং কাওরাইদ ১নং সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মাধ্যমিক শিক্ষা কেটেছে কাওরাইদ কেএন উচ্চ বিদ্যালয়ে। রাজধানীর তেজগাওয়ের বিএএফ শাহীন কলেজে শিক্ষা জীবনের আরো দুটি গুরুত্বপূর্ণ বছর। এখন পড়াশোনা করছি বেসরকারি ইস্টওয়েস্ট ইউনিভার্সিটিতে।’

ইভান বলেন, ‘মাধ্যমিকে উঠার পর ইংরেজি বইতে একটা অধ্যায় পড়েছিলাম ‘সাবিনা’স ডায়েরি’। ওখানে পড়েছিলাম সাবিনা ডায়েরিতে তার প্রতিদিনকার গল্পগুলো লিখে রাখে। সেটা দেখে দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। আমিও সবকিছু লিখে রাখতে চেষ্টা করতাম।’

বহু খ্যাতিমান কবি-সাহিত্যিক ও গুণীজনের সাক্ষাতকার নিয়েছেন ইভান। দেশের বড় বড় সমস্যাগুলো নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন করেছেন মন্ত্রীদের কাছে।

প্রাপ্তির খাতায় ছোট-বড় অনেক কিছু যুক্ত হয়েছে তার। বড় বড় ব্যক্তিত্বের সান্নিধ্য পেয়েছে। জাতিসংঘ শিশু তহবিল ইউনেসফ থেকে পেয়েছে মিনা মিডিয়া এ্যাওয়ার্ড। ২০১৬ ও ২০১৭ সালে পর পর দু’বার সাংবাদিকতা বিভাগে তিনটি এ্যাওয়ার্ড উঠেছে ইভানের হাতে। এছাড়াও ২০১৭ সালে পেয়েছে প্রজ্ঞা তামাক নিয়ন্ত্রণ সাংবাদিকতা পুরষ্কার।

সাংবাদিকতায় অনুপ্রেরণা কারা দিয়েছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাকে সেভাবে কেউ কাজের অনুপ্রেরণা দেয়নি। নিজের মধ্যেই বড় হওয়ার তাগিদ অনুভব করেছি। এরপর থেকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছি। তবে ছোট ছোট কিছু বিষয় আমাকে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দেয়। এই যেমন ইউনিসেফের পুরষ্কারগুলো। তাছাড়া এবারের বইমেলায় ৫০ জন তরুণের জীবনের গল্প নিয়ে তরুণ তারকাদের গল্প নামে একটি বই বের হয়েছিল।এতে আমার জীবনের গল্পও স্থান পেয়েছে।’

এই তরুণ সাংবাদিক আরো বলেন, ‘বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) শিশু শ্রমিকদের নিয়ে বিভিন্ন সাংবাদিকের লেখা প্রতিবেদন বাছাই করে একটা বই বের করেছিল। এটাতেও আমার একটি প্রতিবেদন স্থান পায়। এই ছোট ছোট বিষয়গুলো আমাকে অনেক ভাবায়। কাজের প্রতি দায়িত্ব বাড়ার বিষয়টিও অনুভব করি এ থেকেই।’

সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ বিষয়ে জানতে চাইলে ইভান বলেন, ‘সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ হলো- ছোটরাও যে কলম ধরতে জানে, নিজের অধিকার নিয়ে গণমাধ্যমে বলতে জানে। এটা সাধারণ মানুষের ধারণার বাইরে ছিল। যখন আমি মাঠপর্যায়ে কাজ করেছি তখন একটা বিষয় লক্ষ্য করে দেখেছি যে, সাধারণ মানুষ আমাদের কাজে সহযোগিতা করতে চায় না। গণমাধ্যম অনেকের কাছে আতঙ্কেরও বিষয়, এটা একটা কারণ হতে পারে। তবে বড় কারণ হলো ছোট বলে এড়িয়ে যাওয়া।’

‘তবে সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে আমি সবধরণের সহযোগিতা পেয়েছি। কখনো কোনো প্রতিবেদনের জন্য কোনো মন্ত্রীর বক্তব্য দরকার হলে তাদের গেছে গেলে সেটা তারা গুরুত্ব সহকারে দেখেছেন। অনেক সময় আমাদেরকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষাও করেছেন।’

সাংবাদিকতায় কোন মজার গল্প আছে কি না? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘মজার গল্প বলতে তেমন কিছু নেই। আমার নিজের প্রতিবেদন প্রকাশিত/প্রচারিত হলে আমার নিজের কাছে সবচেয়ে মজা লাগত। শুধু এতটুকুতেই থেমে থাকতাম না, পরিচিত যারা আছে সবাইকে সেটা জোর জবরদস্তি করে দেখাতাম ও পড়াতাম।’

ইভান বলছিলেন, ‘ভালোলাগা কাজ করতো যখন শুনতাম আমার প্রতিবেদন প্রকাশের পর সমস্যাটির সমাধান হয়েছে। একটি প্রতিবেদন করেছিলাম, “অনেক প্রাথমিক বিদ্যালয়েই শিশুদেরকে শৌচাগার ব্যবহার করতে দেননা শিক্ষকরা” এই প্রতিবেদনের পর শিক্ষা কর্মকর্তা সেটার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। আরেকটা প্রতিবেদন করেছিলাম, “শারীরিক শিক্ষা বইয়ের বয়ঃসন্ধির অধ্যায়গুলো শিক্ষার্থীদের বিস্তারিত পড়ান না শিক্ষকরা।” প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর একটা গবেষণা সংস্থা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে বিভিন্ন তথ্য নিয়েছিল। এরকম আরো অনেক উদাহরণ রয়েছে। এগুলোও একধরণের উৎসাহ আমার জন্য।’

ভবিষ্যত পরিকল্পনা সম্পর্কে ইভান বলেন, ‘গণমাধ্যমে কাজ করার ইচ্ছাটা হঠাৎ করেই আসেনি। ছোট থেকেই আকাঙ্খা ছিল মানুষের জন্য কিছু করবো এবং আমার দেশকে পরিচয় করিয়ে দিবো বিশ্বের কাছে। এরপর ভেবে দেখলাম গণমাধ্যমকর্মী হলেই আমি এটা সম্ভব করতে পারবো। সেই ভাবনা থেকেই নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি।’

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1617 seconds.