• ১৫ মে ২০১৮ ১৪:৫৪
  • ১৫ মে ২০১৮ ১৫:১৪
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

প্রাণ দিয়ে জানিয়ে গেলেন স্পর্ধার আরেক নাম ফাদি আবু সালাহ!

ফাদি আবু সালাহর এই ছবিটি ভাইরাল হয়ে যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ইসরায়েলি স্নাইপারের গুলিতে বিক্ষোভরত অবস্থায় নিহত হন ফাদি। ছবি : সংগৃহীত


আবদুল্লাহ মাহফুজ অভি :


কৃত্তিম পা লাগিয়ে চীনা নাগরিক ৬৯ বছরের শিয়া বোও যখন এভারেস্টের চূড়ায় উঠে নিজ দেশের পতাকা মেলে ধরলেন ঠিক তখন ২৯ বছর বয়েসি ফিলিস্তিনি যুবক ফাদি আবু সালাহ হুইল চেয়ারে করে ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রতিবাদ করে প্রাণ দিলেন। পৃথিবীর দুই প্রান্তে একই দিনে ঘটে যাওয়া দুটি ঘটনা বলে দেয় জীবন কত রকম অর্থ প্রকাশ হয় জীবনেরই কাছে। শিয়া বোও ১৯৭৫ সালে এভারেস্ট চূড়ায় উঠতে গিয়ে অসুস্থ হন। তারপর ফিরে আসতে হয়। এর জের ধরেই পায়ে ক্যান্সার আক্রান্ত হন তিনি। এরপর ১৯৯৬ সালে হাঁটুর নিচ থেকে দুই পা কেটে ফেলতে হয়। কিন্তু তারপরও এভারেস্ট জয়ের স্বপ্ন দমিত হয়নি। লড়াই চালিয়ে গেছেন। অবশেষে ৪৩ বছর পর ১৪ মে সফল হলেন বোও। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে এলো হাসি মুখি শিয়া বোও এর ছবি।

অন্যদিকে ফাদি আবু সালাহ। বয়স ২৯ অথবা ৩০ বছর হবে। কোথাও তার বয়স ২৯ দাবি করা হচ্ছে কোথাও আবার ৩০। আমাদের আলোচনায় এই এক বছরের তথ্যগত গড়মিল খুব একটা ব্যঘাত ঘটাবে বলে মনে হয় না। ১৪ মে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম গুলোতে এই যুবকের ছবিও প্রকাশ পায়। পা নেই, হুইল চেয়ারে বসা এই যুবক তার পেশি বহুল হাত দিয়ে পিকেটিং করছেন। মুখে ফুটে উঠেছে তীব্র প্রতিবাদ প্রতিরোধের এক মর্যাদা সম্পন্ন ছবি। এই ফিলিস্তিনি যুবককে স্পর্ধার প্রতীক বীর হিসেবে মন্তব্য করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে তার ছবি পোস্ট করেন অনেকেই। ফেসবুক টুইটারে মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায় ফাদি।

ফিলিস্তিনির একটি ক্যাম্পে শিশুদের সাথে ফাদি আবু সালাহ

তবে দুঃখ বিষাদের খবরটিও সাথে জানান দেন অনেকেই। ফাদির ভাইরাল হওয়া সেই ছবিটিই মৃত্যুর আগ মুহূর্তের ছবি! লড়াইরত (পিকেটিং) ফাদি এরপর ইসরায়েলি স্নাইপারের গুলিতে নিহত হন। তার দুই পা হারানোর ঘটনাও একই ছিলো। কোন দুর্ঘটনায় কিংবা কোন অসুখে নয়, ফাদি পঙ্গুত্বও বরণ করেছিলেন লড়াই করতে গিয়ে। ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করার সময় বিমান হামলায় পা হারান তিনি। এরপর হুইল চেয়ারে করেই ঘুরে বেড়িয়েছেন। কাজ করেছেন। সর্বশেষ প্রাণ দিলেন আরেকটি বিক্ষোভে গিয়ে। জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থাপনকে কেন্দ্র করে ভূমি দিবসের চলমান বিক্ষোভে (গ্রেট রির্টান মার্চ) অংশ নিয়েছিলেন ফাদিও। সেই বিক্ষোভে ইসরায়েলিদের গুলিতে অর্ধশতাধিক নিহতের তালিকায় প্রকাশ পেলো তার নামটিও।

মার্কিন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক এ্যালেক্স কেইন বর্তমানে ফিলিস্তিনিদের বিক্ষোভের সংবাদ সংগ্রহ করছেন। তিনি ১৪ মে টুইট করেন, ‘আজ ইসরায়েলি স্নাইপারের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছে ফাদি আবু সালাহ। সে এর আগে বিক্ষোভ করতে গিয়ে তার পা হারিয়েছিলো। তবুও থেমে যাননি। হুইল চেয়ারে করে চালিয়ে গেছেন প্রতিবাদ।’

তখনও বেঁচে ছিলেন হয়তো প্রতিরোধ কিংবা ভালোবাসার স্বপ্ন নিয়ে। মটরযানে করে দুই শিশুকে আর তার হুইল চেয়ার নিয়ে কোথাও যাচ্ছিলেন ফাদি...

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের ফেসবুক পেইজ, টুইটার এবং সংবাদকর্মীদের ব্যক্তিগত একাউন্ট থেকেও ফাদির ছবি পোস্ট করে তার মৃত্যুর খবর দেয়া হয়। কিন্তু সেই সাথে ছিলো তার সাহস বীরত্বের বার্তাও। কি করে আত্মমর্যাদা, অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াই চালাতে হয় এই যুবকের মুখচ্ছবি বিশ্ববাসীকে সে কথাই জানিয়ে দিলো।

১৯৬৭ সালের মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের পর থেকে ইসরায়েল পূর্ব জেরুসালেম দখল করে সেখানে গড়ে তুলেছে দু'লাখ ইহুদিদের জন্য বসতি। আন্তর্জাতিক আইনে এসব বসতি অবৈধ। ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনিদের জোড় করে যেসব এলাকা থেকে উৎখাত করা হয়েছিলো সেখানে আবার ফিরে যাওয়ার জন্য আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলো। গাজা ইসরায়েলি সীমান্তে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা সেই আন্দোলন কর্মসূচির নাম ছিলো ‘গ্রেট রির্টান মার্চ’ বা ‘ফিরে চলার মহান মিছিল’। এই বিক্ষোভ চলা অবস্থাতেই জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস খোলার প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্ষোভে উত্তাল হয়ে ওঠে গাজা। এই দূতাবাস খোলা মানে পুরো জেরুজালেমের নিয়ন্ত্রণ নিতে ইসরায়েলকে ওয়াশিংটনের স্বীকৃতি দেওয়া বলে মনে করছেন ফিলিস্তিনিরা। এমনই এক বিক্ষোভে অংশ নিয়েছিলেন ফাদি আবু সালাহ।

ফাদির জানাজা পড়ানো হচ্ছে

এই প্রতিবাদ লড়াই ছিলো তাদের অস্তিত্ব, মর্যাদা, ভূখন্ডের জন্য। ১৪১ বর্গমাইলের গাজার বাতাসে এখন শুধু পোড়া গন্ধ। মৃত্যুর সাথে এখানকার মানুষের বসবাস। কিন্তু আত্ম মর্যাদা, অধিকারে  প্রশ্নে অদ্ভুত এক স্পর্ধার নাম ফিলিস্তিনি! দুর্লভ এক সাহসের নাম গাজা! এমন স্পর্ধা এমন সাহস এমন প্রতিশ্রুতির সংকটের কারণেই পৃথিবীতে দেশে দেশে শাষনের নামে শোষন, বন্ধুত্বের নামে আগ্রাসন, চুক্তির নামে দাসত্বের এক কানামাছি খেলা দেখতে পাচ্ছি আমরা। অথচ সেই সময়ে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে স্পর্ধা দেখিয়ে লড়ে যাচ্ছে ফিলিস্তিনিরা। তাদের প্রতিবাদেই প্রেম, প্রতিরোধেই সংসার, বিক্ষুদ্ধ স্লোগানই কবিতা।

কফিনে ফাদির মৃত দেহে স্বজনদের শেষ শ্রদ্ধা

এই যুবকের ছবি যখন বিশ্ব ভ্রমণ করছে তখন সে যাত্রা করেছে অনন্তের পথে। কিন্তু তার আগে তার জীবনের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে গেছে। শোকার্ত গাজাবাসীর কাছে তার মৃত দেহও লড়াইয়ের আরেক প্রেরণা। ফিলিস্তিনিরা এখন অশ্রু চোখেও লড়তে জানে। এই যুবক যার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। ট্রাম্পের মতো শাষকেরা যখন ক্ষমতা আর অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে বিশ্বকে শোষন করছে। অপেক্ষাকৃত দূর্বলদের নির্যাতন করছে। অন্যের স্বার্বভৌমত্ব ধ্বংস করছে তখন মার্কিন মদদপুষ্ট ইসরায়েলি সীমান্তের দিকে এগিয়ে যাওয়া ফাদির হুইল চেয়ার তাদের বিপরীত বার্তা দিচ্ছে। পা বিহিন ‘অর্ধেক শরীর’ নিয়ে বিক্ষোভে নামা ফাদি বিশ্ব জুড়ে বার্তা দিয়ে গেলো- স্পর্ধার আরেক নাম ফাদি আবু সালাহ। মৃত্যুর আগ মুহূর্তেও এই যুবক শিখিয়ে গেলো দাসত্ব নয় স্পর্ধাই জীবন। দালালী নয় প্রতিরোধেই মুক্তি। মানুষ মানে মর্যাদার সাথে বাঁচা। মানুষ মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মাথা নত না করা।

লেখক : সাংবাদিক ও নির্মাতা

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1731 seconds.