• ২৮ এপ্রিল ২০১৮ ২০:২২:০০
  • ২৮ এপ্রিল ২০১৮ ২০:২২:০০
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

সড়ক-মহাসড়কের পেভমেন্ট

থাকার কথা ২০ বছর থাকছে ১ বছর


শামীম রাহমান


জাতীয় মহাসড়কের পেভমেন্টের আয়ুষ্কাল ধরা হয় ২০ বছর। যান চলাচলে বার্ষিক ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে ‘রোড পেভমেন্ট ডিজাইন গাইড-২০০৫’ অনুযায়ী এ আয়ুষ্কাল নির্ধারণ করেছে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর। আর আঞ্চলিক মহাসড়কের পেভমেন্টের এ আয়ুষ্কাল (২০ বছর) নির্ধারণ করা হয়েছে যান চলাচলের ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির হিসাবে। যদিও এক বছরেই আয়ুষ্কাল হারাচ্ছে নতুন নির্মিত জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সড়ক-মহাসড়ক নির্মাণে অনেক ক্ষেত্রে নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহার হচ্ছে। সড়ক নির্মাণের যে ‘কিউরিং পিরিয়ড’ থাকে, মানা হচ্ছে না তাও। এর ওপর সড়ক-মহাসড়কে চলছে সক্ষমতার অতিরিক্ত ভারী যানবাহন। যান চলাচলের অস্বাভাবিক প্রবৃদ্ধিও সড়ক-মহাসড়কের পেভমেন্টের আয়ুষ্কাল কমিয়ে দিচ্ছে।

এসবের পাশাপাশি দুর্বল ফাউন্ডেশনও সড়ক-মহাসড়কের স্থায়িত্ব দ্রুত হ্রাসের কারণ বলে জানান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. শামছুল হক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, সড়কের স্থায়িত্ব নষ্টের কারণগুলো আমাদের জানা। টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী সড়ক পেতে হলে প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে গ্রিনফিল্ড তৈরি করে নেয়াটা জরুরি। দুভাগে প্রকল্প বাস্তবায়ন করলে প্রকৌশলগত অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। এক্ষেত্রে প্রথম ভাগে ভূমি অধিগ্রহণ, অভ্যন্তরীণ পরিষেবা স্থানান্তরসহ আনুষঙ্গিক কাজগুলো করতে হবে। পরের ধাপে দ্রুততার সঙ্গে নির্মাণ করে ফেলতে হবে। এগুলোর জন্য প্রয়োজনে দুটি পৃথক প্রকল্প নেয়া যেতে পারে।

টেন্ডার প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আনার ওপরও জোর দেন এ যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সড়কগুলোর গুণগত মান খারাপ হওয়ার পেছনে বিদ্যমান টেন্ডার প্রক্রিয়া অনেকটা দায়ী। টেকসই ও মানসম্মত সড়কের জন্য টেন্ডার প্রক্রিয়ার পরিবর্তন জরুরি। সর্বনিম্ন দরদাতাকে কাজ দিয়ে কতটুকু টেকসই উন্নয়ন হবে, তা ভাবতে হবে। টেন্ডারের মাধ্যমে শুধু রাস্তা নির্মাণ নয়, পরবর্তী ৮-১০ বছরের রক্ষণাবেক্ষণের কাজও ঠিকাদারকে দিতে হবে।

নির্মাণের বছর না ঘুরতেই পেভমেন্ট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার নজির সৃষ্টি করেছে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেন মহাসড়ক। ২০১৬ সালে শেষ হওয়ার এক বছর না যেতেই মহাসড়কটির মিরসরাই, কুমিল্লা, ফেনীসহ বিভিন্ন স্থানে তৈরি হয়েছে খানাখন্দ। নির্মাণের এক বছরের মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কও। এর বাইরে চট্টগ্রামের আরাকান-বহদ্দারহাট, কুষ্টিয়া থেকে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, গৌরনদী-গোপালগঞ্জ-খুলনা, পাগলা-জগন্নাথপুর-রানীগঞ্জ-আউশকান্দি, ঢাকা-বরিশালসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়ক নির্মাণের বছরখানেকের মধ্যেই খানাখন্দ ও ভাঙাচোরা দশায় চলে গেছে।

সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন) মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, আয়ুষ্কালের বিষয়টি অনেক বিষয়ের ওপর নির্ভর করে। কাজের গুণগত মান, সড়কে চলাচলরত যানবাহনের সংখ্যা, অতিরিক্ত পণ্যবোঝাই যান চলাচল, জলাবদ্ধতা আয়ুষ্কালে প্রভাব ফেলে।

সড়ক নির্মাণের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বিটুমিন। যদিও নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহারের বিষয়টি উঠে এসেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) এক প্রতিবেদনে। তাতে বলা হয়েছে, মহাসড়কে ৬০/৭০ গ্রেডের বিটুমিন ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হলেও তা অমান্য করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো ব্যবহার করছে ৮০/১০০ গ্রেডের বিটুমিন। নিম্নমানের এ বিটুমিন ব্যবহারের কারণে গরমের সময় তা গলতে শুরু করে। এ কারণে সড়কে গর্ত ও ফাটল দেখা দেয়, পেভমেন্টও উঠে যায়।

পেভমেন্টের আয়ুষ্কালের জন্য কিউরিং পিরিয়ডও গুরুত্বপূর্ণ। পেভমেন্ট নির্মাণের পর কমপক্ষে ৪৮ ঘণ্টা কিউরিং পিরিয়ড রাখতে হয়। কিন্তু বিকল্প সড়ক না থাকায় তার আগেই যান চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয় পেভমেন্ট।

বিষয়টি স্বীকারও করেন কেন্দ্রীয় সড়ক গবেষণাগারের পরিচালক ড. আব্দুল্লাহ আল মামুন। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, সড়কে পেভমেন্ট বসানোর ৪৮ ঘণ্টা ‘কিউরিং টাইম’ রাখতে হয়। এ সময় সড়কটি কোনোভাবেই ব্যবহার করা যায় না। কিন্তু বিকল্প সড়কের অভাবে আমাদের দেশে সড়ক বানানোর পর এ নিয়ম মানা সম্ভব হয় না। পেভমেন্টের আয়ুষ্কালে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

সড়কে যান চলাচলের অস্বাভাবিক প্রবৃদ্ধিকে আয়ুষ্কাল দ্রুত শেষ হওয়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা। সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, জাতীয় মহাসড়কে যান চলাচলের প্রবৃদ্ধি বছরে ১০ শতাংশের মধ্যে থাকলে আয়ুষ্কাল স্বাভাবিক থাকে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) পরিচালিত ‘রোড মেইনটেন্যান্স অ্যান্ড ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের’ এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০০৭ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের চান্দিনা, কুমিল্লা ও ফেনী বাইপাস এলাকায় প্রতি বছর ১৭ শতাংশ হারে যান চলাচল বেড়েছে। সীতাকুণ্ড-চট্টগ্রাম সড়কে এ সময়ে যান চলাচল বেড়েছে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ হারে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার অংশে যান চলাচল বেড়েছে ২২ দশমিক ৯ শতাংশ হারে। বাড়তি যানবাহনের কারণে দ্রুত আয়ুষ্কাল হারাচ্ছে এসব সড়ক।

সড়কের স্থায়িত্ব রক্ষায় ২০১২ সালে এক্সেল লোড নীতিমালা প্রণয়ন করে সরকার। এ নীতিমালা অনুযায়ী, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের পণ্য পরিবহনের সর্বোচ্চ সীমা ২০ টন। আর প্রাইম মুভার, ট্রেইলারের পণ্য বহন ক্ষমতা ৩৩ টন। দেশে চলাচলরত দুই এক্সেলের ট্রাকের ক্ষেত্রে সামনের চাকায় লোড হবে সাড়ে পাঁচ টন ও পেছনের চাকায় ১০ টন। অর্থাৎ ছয় চাকার ট্রাকের সর্বোচ্চ ওজন বহন ক্ষমতা সাড়ে ১৫ টন। এর অতিরিক্ত পণ্য পরিবহন করলে জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। তার পরও অতিরিক্ত পণ্যবাহী যান চলাচল বন্ধ হচ্ছে না, যা সড়কের আয়ুষ্কাল কমিয়ে দিচ্ছে।

বিকল্প সড়ক না থাকায় বাংলাদেশে কোনো সড়ক নির্মাণ বা সংস্কারকাজ চলাকালে ওই সড়ক দিয়েই যানবাহন চলাচল করে। ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে সড়ক উদ্বোধনের আগেই সড়ক-মহাসড়কের ব্যবহার শুরু হয়। এতে যে অংশটি শুরুতেই নির্মাণ বা সংস্কার করা হয়, সে অংশটির আয়ুও শেষ হয় আগেই। ঢাকা-চট্টগ্রাম, জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ, নির্মাণাধীন জয়দেবপুর-টাঙ্গাইল সড়কের নির্মাণ সময় বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব সড়ক নির্মাণে ছয়-সাত বছর সময় লেগে যাচ্ছে।

এর আগে জয়দেবপুর-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করার কাজ শুরু হয় ২০১০ সালের জুলাইয়ে। তিন বছরের মধ্যে মহাসড়কটির নির্মাণকাজ শেষ করার কথা থাকলেও লেগে যায় ছয় বছর। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কটির চার লেনের কাজও শুরু হয় ২০১০ সালের শেষের দিকে। প্রাথমিকভাবে সড়কটির নির্মাণকাজ ২০১২ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও একাধিকবার মেয়াদ বাড়িয়ে শেষ হয় ২০১৬ সালের মাঝামাঝি। বিকল্প সড়ক না থাকায় নির্মাণকালেই ব্যবহার হয় এ দুই মহাসড়কও। এতে নির্মাণ শেষের আগেই গুরুত্বপূর্ণ এ দুই মহাসড়কেরও বিভিন্ন অংশের আয়ুষ্কালের বড় অংশ পেরিয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

মহাসড়ক পেভমেন্ট

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0179 seconds.