• ১৩ এপ্রিল ২০১৮ ১৫:২৫:৫৯
  • ১৩ এপ্রিল ২০১৮ ১৫:৪১:৪৩
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

সেই সময়ের যোদ্ধা ছাদেক এই সময়ের বৃক্ষ ছাদেক

মুক্তিযোদ্ধা ছাদেকুর রহমান ছাদেক। ছবিঃ রাশেদুল ইসলাম

রাশেদুল ইসলাম :

গাবতলী থেকে শ্যামলী আসার পথে হঠাৎ কানে ভেসে এলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর ভাষণ। ঢাকা শহরে এমন ভাষণ নতুন কিছু নয়। তবে স্কুটারে মাইক লাগিয়ে জাতির পিতার ভাষণ সচরাচর দেখা বা শোনা যায় না। উৎসুক মন নিয়ে স্কুটির কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। সাদা শার্ট কালো প্যান্ট পরনে একজন অর্ধবয়স্ক লোক সবাইকে কি যেন জানাচ্ছেন। প্রথমে মনে হয়েছিল মলম বিক্রেতা। কিন্তু না তিনি মলম বিক্রিও করেন না ৩০০ টাকার এনার্জি বাল্ব ১০০ টাকাতেও বিক্রি করেন না। তিনি মানুষকে ঔষধি গাছ ও ফলের গাছ লাগানোর পরামর্শ দেন। তার কারণ তিনি স্বপ্ন দেখেন দেশরত্ন শেখ হাসিনার বাংলা গড়ে উঠুক সবুজে।

তার এমন মহৎ উদ্দেশ্য দেখে তার সাথে কথা বলার ইচ্ছা জাগলে নিজের পরিচয় দিয়ে তাকে প্রশ্ন করলাম, আপনার নাম? উত্তরে তিনি বললেন- ছাদেকুর রহমান ছাদেক (৬৩)। পেশা জিজ্ঞাসা করতেই বললেন- ভারত থেকে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত একজন মুক্তিযোদ্ধা তিনি। ৩নং সেক্টর থেকে যুদ্ধ করেছেন। বর্তমানে ফার্মগেটের হোটেল ইন্দ্রপুরি ইন্টারন্যাশনালে ম্যানেজার পদে কাজ করছেন।

অবসর সময় পেলেই তিনি রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে পথসভা করতে বেরিয়ে পড়েন। নিজের স্কুটারের সঙ্গে রাখেন মাইক, ফেস্টুন, কাঁচি, কোদাল, ফল ও ঔষধি-গাছ। কথা বলেন ছন্দ মিলিয়ে, যেন তিনি সবুজের কবি। যেমন ‘পরিবেশ বাঁচান, জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি কমান’ কিংবা ‘দেশ থেকে চিরতরে দারিদ্র তাড়ান, শুধু ফল আর ঔষধি গাছ লাগান’। চলমান বৃক্ষরোপন কর্মসূচিতে তার স্লোগান ‘অধিক বৃক্ষ ফল আর ঔষধি, দেশে বয়ে আনবে সমৃদ্ধি’।

কথা বলার এক পর্যায়ে তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর উদ্দেশ্যে তিনি বারোটি খোলা চিঠি পাঠিয়েছেন। যার কোন প্রতিউত্তর তিনি এখনও পাননি। তিনি আরো বলেন, শুরুতে আমার এই কর্মকাণ্ড দেখে মানুষ অনেক হাসাহাসি করতো। উপহাস করতো আমাকে নিয়ে। কিন্তু রবিন্দ্রনাথের সেই গানের লাইনটি আমি মনে ধারণ করি ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলোরে’। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে আমি এই পথসভা করে যাচ্ছি। সেই সঙ্গে শহরের আনাচে কানাচে যেখানে খালি জায়গা পাই সেখানেই নিজ উদ্যোগে গাছের চারা লাগাই।

কথার এক পর্যায়ে বর্তমান কোটা সংস্কার প্রসঙ্গে তার মতামত জানতে চাইলে তিনি বাংলা ডট রিপোর্টকে বলেন, মেধার মূল্যায়ন অবশ্যই করতে হবে। তবে তিনি এটাও বলেন যখন যুদ্ধ করেছি তখন ভাবিনি দেশে কোটা নামক কিছু হতে পারে যার সুবিধা অসুবিধা নিয়ে বাংলায় এমন গোলযোগ সৃষ্টি হবে। আমরা যারা মুক্তি যোদ্ধারা আছি তারা আর সর্বোচ্চ ১০-১২ বছর বাঁচবো। এরপর আমাদের নাতি নাত্নিরা এর সুবিধা আদৌ পাবে কিনা তা আমার জানা নেই। দেখা যাবে এক সময় এই কোটা এমনিতেই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। আমি নিজে ১০ হাজার টাকা ভাতা পাই যে ভাতার একটি টাকাও আমি আমার বাবা-মাকে খাওয়াতে পারিনি। একমাত্র দারিদ্রতার কারণে আমার বাবা বিনা চিকিৎসায় মারা গিয়েছে। অথচ তখন আমার ভাতা ছিল না। কিন্তু এখন আমি নিজে কাজ করি সুতরাং এই ভাতার প্রতি আমার কোনো ভক্তি বা শ্রোদ্ধা নেই। আর এই কারণে এই টাকাটা আমি সরকারের পেছনেই খরচ করি।

কিভাবে করেন তার উত্তরে তিনি বলেন, এখন মরণের সময় হয়েছে, নামাজ রোযাও ঠিকভাবে করা হয় নাই। আমি নিজে দারিদ্রতার মাঝে থেকেছি, ভাতের ক্ষুদা দেখেছি আর তাই সন্ত্রাস মুক্ত সমাজে ‘দারিদ্র বিমোচন একমাত্র হাতিয়ার, ফল আর ওষুধি গাছ লাগাতে হবে সবার। আর এই গাছ লাগালে আমার মৃত্যুর পরেও আমি ছওয়াব পাবো। একটা গাছের মালিক ততদিন পর্যন্ত ছওয়াব পাবে যতদিন পর্যন্ত এই গাছের ফল পশু পাখি খাবে। পাশাপাশি দেশের প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়বে। মানুষের কল্যানে আসবে এই গাছ।

সরকারের উদ্দেশ্যে এই মুক্তিযোদ্ধা বলেন, আমাদের বঙ্গবন্ধু দারিদ্রমুক্ত ক্ষুদা মুক্ত দেশ চেয়েছিলেন। আসলে কি আমরা পেয়েছি এমন দেশ। আমরা আদৌ এমন দেশ পাইনি। সুতরাং জননেত্রী শেখ হাসিনার অনেক কর্মকাণ্ডেও ভুল আছে যার সংশোধন করা দরকার। আর এই সংশোধনেই হতে পারে সোনার বাংলা। আমরাই হতে পারি পৃথিবীর সেরা জাতি।

দুই মেয়ে ও এক ছেলে নিয়ে ছাদেকুর রহমানের সংসার। তিন সন্তানের মাঝে তার এক কন্যাই শুধুমাত্র কোটার সুবিধায় স্কুলে ভর্তি হবার সুযোগ পেয়েছে। অন্য দুই সন্তান পাননি।

দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে ঢাকার অলিতে গলিতে ছাদেকুর রহমান ঘুরে বেড়াচ্ছেন আর জনসচেতনতায় জানাচ্ছেন ধান, আখের চাষ প্রতি বছর করতে হয় কিন্তু ফলের গাছ একবার রোপন করলে শতবছর পার হয়। আর তাই সবার কাছে তার আহ্বান- প্রাকৃতিকভাবে দেশকে খাদ্যে পরিপূর্ণ করতে শুধু ফল আর ওষুধি গাছ লাগান, পরিবেশ বাঁচান-প্রতিবেশী বাঁচান, জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি কমান, নিজে বাঁচুন-দেশকে বাঁচান।

বাংলা/এমএইচ

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

ছাদেকুর রহমান ছাদেক গাছ

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1636 seconds.