• নিজস্ব প্রতিবেদক
  • ০৩ জানুয়ারি ২০১৮ ১২:০৩:৫৩
  • ০৩ জানুয়ারি ২০১৮ ১২:১০:৪৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

যশোরের খেজুরের গুড় যেন প্রকৃতির ভালোবাসার দান

ছবি: বাংলা

ঠাণ্ডা বাতাস আর কুয়াশার চাদরে বাংলার বুকে অনেক আগেই এসেছে শীত। শীতের মৌসুমে গ্রাম বাংলায় ধুম পড়ে বিভিন্ন স্বাদের পিঠা খাওয়ার। আর পিঠার স্বাদ বাড়াতে গুড়ের ভূমিকা অনেক বেশি। যেমন, খেজুরের গুড়ের তৈরি পিঠা-পায়েস বাঙ্গালির অনেক প্রিয় একটি খাবার। আর খেজুরের গুড়ের জন্য সেই প্রাচীনকাল থেকেই যশোর জেলা বিখ্যাত। আর এখন পর্যন্ত খেজুরের গুড়ের জন্য বিখ্যাত শহর হল যশোর। টাটকা ভেজালমুক্ত খেজুরের গুড় যশোর থেকে তৈরি হয়ে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ জুড়ে।

প্রাচীনকাল থেকে বিখ্যাত এই খেজুরের গুড়ের মান বজায় রাখতে গাছিরা সব সময় চেষ্টা করেন ভেজাল মুক্ত থাকতে। শীত এলেই ব্যস্ত গাছিরা শুরু করেন রস সংগ্রহ করা। এখনো পর্যন্ত গাছিরা চিরাচরিত সনাতন নিয়মেই মাটির ভাড়ে রাতভর রস সংগ্রহ করেন। ভোরের আলো ফোটার আগেই গাছিরা কুয়াশা ভেদ করে গাছ থেকে রস ভর্তি মাটির ভাড় নামিয়ে সেই রস জ্বালিয়ে তৈরি করেন গুড়-পাটালি। নলেন গুড় পাটালির মধ্যে নারিকেল কোরা, তিল ভাজা মিশালে অন্যরকম স্বাদ নিয়ে আসে। গাছিদের এই রস সংগ্রহ করা থেকে শুরু করে গুড় তৈরি অবদি প্রতিটি দৃশ্য যেন বাংলার রূপকে এক স্বর্গ রাজ্যে তৈরি করে। বর্তমানে পুরো শীত জুড়ে যশোরে চলবে রস সংগ্রহ আর গুড় বানানোর ধুম।

ইতোমধ্যেই ঐতিহ্যের প্রতীক মধুবৃক্ষ থেকে সুমধুর রস বের করে গ্রামের ঘরে ঘরে শুরু হয়েছে গুড়-পাটালি তৈরির উৎসব। গ্রামে গ্রামে খেজুরের রস জ্বালিয়ে পিঠা, পায়েস, মুড়ি-মুড়কী ও নানা রকমের মুখরোচক খাবার তৈরি করার ধুম পড়েছে। রসে ভেজা কাচি পোড়া পিঠার (চিতই পিঠা) স্বাদই আলাদা।

বর্তমানে শহরের ছেলেমেয়েদের মাঝে কাঁচা রস খাওয়া একটি উপভোগ্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সকালে এবং সন্ধ্যায় কাঁচা রস খেতে খুবই মজাদার। ভোর হলেই দেখা যায় দল বেধে বিভিন্ন বয়সী ছেলে মেয়েরা ছুটে যান রস খেতে। শীতের সকালটা যেন প্রকৃতির দেওয়া এই সুস্বাদু রস দিয়েই শুরু করতে চান তারা।

যশোরের ঐতিহ্যবাহী গুড়-পাটালির ইতিহাস অনেক প্রাচীন। ব্রিটিশ আমলে খেজুর গুড় থেকে চিনি তৈরি করা হতো। এই চিনি 'ব্রাউন সুগার' নামে পরিচিত ছিল। এই চিনি ইউরোপসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানো হত।

বিলেত থেকে সাহেবেরা দলে দলে যশোর অঞ্চলে এসে চিনির কারখানা স্থাপন করে চিনির ব্যবসা করত। তখন চিনির কারখানাগুলো চৌগাছা এবং কোটচাঁদপুর শহরের আশেপাশে কেন্দ্রীভূত ছিল।

যশোরের ইতিহাস থেকে জানা যায়, চৌগাছা এবং কোটচাঁদপুর এর আশেপাশে সে সময় প্রায় পাঁচশ চিনি কারখানা গড়ে উঠেছিল। তখন কলকাতা বন্দর দিয়ে খেজুর গুড় থেকে উৎপাদিত চিনি রপ্তানি করা হতো। মূলত ১৮৯০ সালের দিকে আখ থেকে সাদা চিনি উৎপাদন শুরু হলে খেজুর গুড় থেকে তৈরি চিনির উৎপাদনে ধস নামে। একে একে কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যায়। খেজুরের গুড় থেকে চিনি তৈরি না হলেও এখন পর্যন্ত বাঙ্গালির কাছে খেজুর গুড়-পাটালির কদর কমেনি।

পর্যাপ্ত নলেন গুড়, পাটালি পাওয়া দুষ্কর। মৌসুমে যা তৈরি হয় তা রীতিমত কাড়াকাড়ি শুরু হয়ে যায়। আবহমান কাল থেকে তাই বাংলায় নবান্নের উৎসব পালনে খেজুর গুড়ের কদর বেশি। বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে গাছিরা গাছ পরিষ্কার বা তোলা চাচার উপকরণ গাছি দা, দড়ি তৈরি সহ ভাঁড় (মাটির ঠিলে) ক্রয় ও রস জ্বালানো জায়গা ঠিক করাসহ বিভিন্ন কাজে রয়েছে ব্যতিব্যস্ত। 

তবে দুঃখের বিষয় যশোর অঞ্চলে খেজুর গাছের সংখ্যা কমে যাওয়ায় ঐতিহ্য ধরে রাখতে সরকারের বনবিভাগের উদ্যোগে খেজুর গাছ রোপণের কাজ শুরু করেছে। 'বৃহত্তর যশোর জেলার জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ ও প্রাকৃতিক পরিবেশ উন্নয়ন' প্রকল্পের আওতায় এ অঞ্চলে রোপিত হয়েছে কয়েক লাখ খেজুর গাছের চারা। তবে ইট ভাটায় খেজুর গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার সরকারিভাবে নিষিদ্ধ না করলে এক সময় খেজুর গাছ পরবর্তী প্রজন্মের কাছে শুধু আরব্য উপন্যাসের গল্পে পরিণত হবে।

বাংলা/আরআই/এমএইচ

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

যশোর খেজুরের গুড়

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0170 seconds.