• ০৬ ডিসেম্বর ২০১৭ ২০:৪৪:৪৩
  • ০৬ ডিসেম্বর ২০১৭ ২১:২৬:০৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

আবহমান বাংলার শীতল পাটির অতীত ও বর্তমান

ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের আবহমান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যগত কুটির শিল্প শীতল পাটি। এটি মূলত এক ধরনের মেঝেতে পাতা আসন। মুর্তা বা পাটি বেত বা মোস্তাক নামক গুল্মজাতীয় উদ্ভিদের ছাল থেকে এগুলো তৈরি হয়ে থাকে। হস্তশিল্প হিসাবে এগুলোর যথেষ্ট কদর রয়েছে। শহরে শো-পিস এবং গ্রামে এটি মাদুর ও চাদরের পরিবর্তে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। সাজসজ্জা দ্বারা সজ্জিত মাদুরকে নকশি পাটিও বলা হয়।

ইতিহাস:
১৯২০-এর দশকে অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি কর্তৃক বিরচিত “শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত” নামীয় বিশালকার গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের ৪র্থ অধ্যায়ে শীতল পাটি সম্পর্কে নিম্নরূপ বর্ণনা পাওয়া যায়: “এই শিল্পের মধ্যে শীতল পাটি সর্বপ্রধান ও বিশেষ বিখ্যাত। মূর্ত্তা নামক এক জাতীয় গুল্মের বেত্র দ্বারা ইহা প্রস্তুত হয়। ইহা শীতল, মসৃণ ও আরামজনক বলিয়া সর্বত্র আদৃত। বঙ্গদেশের অন্য কোথায়ও এইরূপ উৎকৃষ্ট পাটি প্রস্তুত হইতে পারে না। পাটির বেত্র রঞ্জিত ক্রমে পাশা, দাবা প্রভৃতি বিবিধ খেলার ছক ইত্যাদি চিত্রিত করা হয়।

পাটির মূল্য গুণানুসারে ১০ আনা হইতে ১০ দশ টাকা পর্যন্ত হইতে পারে। বেত্র যত চিকণ হয়, মূল্য ততই বর্ধিত হয়। পূর্বে নবাবের আমলে ২০-২৫ টাকা হইতে ৮০-৯০ টাকা, এমন কি শত দ্বিশত টাকা পর্যন্ত মূল্যের পাটি প্রস্তুত হইত বলিয়াও শুনা যায়। ২০-২১ হাত দীর্ঘ পাটিকে ‘সফ’ বলিয়া থাকে। ইট ও চোঁয়ালিশ পরগণাতেই সর্ব্বোৎকৃষ্ট শীতল পাটি প্রস্তুত হয়। পাটি প্রস্তুতকারকগণ ‘পাটিয়ারা দাস’ নামে খ্যাত। ১৮৭৬-৭৭ খৃষ্টাব্দে শ্রীহট্ট হইতে ৩৯২৭ টাকা মূল্যের পাটি রপ্তানি হইয়াছিল।”

বুনন পদ্ধতি:
যে গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ থেকে শীতল পাটি তৈরী করা হয় তার স্থানীয় নাম “মুর্তা”। স্থানভেদে একে ‘মুসতাক’, ‘পাটিবেত’ ইত্যাদি নামেও অভিহিত করা হয়। মুর্তা গাছ দেখতে সরু বাঁশের মতো; জন্মে ঝোপ আকারে। গোড়া থেকে কেটে পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয় মুর্তার কাণ্ড। দা দিয়ে চেঁছে পাতা ও ডাল-পালা ফেলে দেয়া হয়, দূর করা হয় ময়লা। এরপর মাটিতে মাছকাটার বটি ফেলে মুর্তার কাণ্ডটিকে চিড়ে লম্বালম্বি কমপক্ষে চারটি ফালি বের করা হয়। কাণ্ডের ভেতর ভাগে সাদা নরম অংশকে বলে ‘বুকা’। এই বুকা চেঁছে ফেলে দেয়া হয়। যে ব্যক্তি পাটি তৈরী ক’রে তাকে বলা হয় ‘পাটিকর’ বা ‘পাটিয়াল’।

পাটিকরের লক্ষ্য থাকে মুর্তার ছাল থেকে যতটা সম্ভব সরু ও পাতলা ‘বেতী’ তৈরী করে নেয়া। বেতী যত সরু ও পাতলা হবে পাটি তত নরম ও মসৃণ হবে। এজন্য হাতের নখ দিয়ে ছিলে বুননযোগ্য বেতী আলাদা করা হয়ে থাকে। বেতী তৈরী হওয়ার পর এক-একটি গুচ্ছ বিড়ার আকারে বাঁধা হয়। তারপর সেই বিড়া ঢেকচিতে পানির সঙ্গে ভাতের মাড় এবং আমড়া, জারুল ও গেওলা ইত্যাদি গাছের পাতা মিশিয়ে সিদ্ধ করা হয়। এর ফলে বেতী হয় মোলায়েম, মসৃণ ও চকচকে। রঙ্গীন নকশাদার পাটি তৈরীর জন্য সিদ্ধ করার সময় ভাতের মাড় ইত্যাদির সঙ্গে রঙের গুঁড়া মেশানো হয়। 

দক্ষ কারিগর একটি মুর্তা থেকে ১২টি পর্যন্ত সরু বেতি তৈরী করতে সক্ষম। ছিলে ছিলে বেতী তৈরীর সময় পাটিকর বুড়ো আঙ্গুল ও মধ্যমায় কাপড় পঁচিয়ে নেয় যাতে বেতীর ধারে আঙ্গুল না ফেঁড়ে যায়। পাটিকর মাটিতে বসে কাপড় বোনার মতই দৈর্ঘ্য-বরাবর এবং প্রস্থ-বরাবর বেতী স্থাপন ক’রে নেয়। পাটি বোনার সময় বেতীগুলোকে ঘন আঁট-সাঁট ক’রে বসানো হয় যাতে ফাঁক-ফোকড় না-থাকে। নকশী পাটির ক্ষেত্রে পাটিকর তার স্মৃতি থেকে বাদামী বা প্রাকৃতিক রঙের বেতীর সঙ্গে রঙ্গীন বেতী মিশিয়ে নকশা তৈরী করে।

বিস্তৃতি:
সিলেট এই পাটির জন্য বিখ্যাত। এছাড়াও বরিশাল, টাঙ্গাইল, কুমিল্লা ও লক্ষ্মীপুর অঞ্চলে এই গাছ জন্মে এবং পাটি ও পাওয়া যায়। ঢাকার নিউমার্কেট, কারওয়ান বাজারে শীতল পাটি কিনতে পাওয়া যায়। এর দাম আকার অনুযায়ী বিভিন্ন হয়। নকশা করা পাটিগুলো দাম বেশি হয়ে থাকে।

বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে পাটি তৈরী-হয়। কিন্তু সিলেট এলাকায় বিভিন্ন স্থানে যে মানের শীতল পাটি তৈরী হয় তা অসাধারণ। সিলেট অঞ্চলের সুনামগঞ্জ প্রভৃতি এলাকায় পাটিকররা তাদের নিপূণতার জন্য শত শত বৎসর যাবৎ প্রসিদ্ধ। শীতল পাটিতে বসে বা শুয়ে যে আরামপ্রদায়ী শীতল অনুভূতি পাওয়া যায় তা ব্যাখ্যাতীত। আধুনিক নগর জীবনেও বিয়ের অনুষ্ঠানে কনের আসন হিসেবে শীতল পাটির ব্যবহার অব্যাহত আছে। শীতল পাটির খণ্ডাংশ অন্যান্য হস্তশিল্পজাত পণ্য তৈরীতে ব্যবহৃত হয়।

ইউনেস্কোর নিবর্স্তুক সাংস্কৃতিক ঐতিহ‌্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্তি:
বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী শীতলপাটির বুনন পদ্ধতিকে ‘ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’ তালিকায় যুক্ত করেছে ইউনেস্কো। বুধবার (৬ ডিসেম্বর) জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি-বিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর ওয়েবসাইটে এ তথ্য জানানো হয়েছে। পরে এদিন বিকালে ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে খবরটি জানান বাংলাদেশ ন্যাশনাল কমিশন ফর ইউনেস্কোর সচিব মঞ্জুর হোসেন।

ইউনেস্কোর ওয়েবসাইটে বলা হয়, দক্ষিণ কোরিয়ার জেজু দ্বীপে সোমবার চলা আন্তঃরাষ্ট্রীয় কমিটির বৈঠকে শীতলপাটির বুনন পদ্ধতিকে ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি তালিকায় যুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। এর আগে ইউনেস্কোর ‘ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ’-এর তালিকায় বাংলাদেশের কারুশিল্প জামদানি এবং বাউল গানও স্থান পায়। গত বছরের নভেম্বরের শেষদিকে ইউনেস্কোর বিশ্ব সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের তালিকায় স্থান পায় বাংলাদেশে বাংলা বর্ষবরণের অন্যতম অনুষঙ্গ মঙ্গল শোভাযাত্রা। এছাড়াও ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় বাগেরহাটের ‘ঐতিহাসিক মসজিদের শহর’, পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহারের ধ্বংসাবশেষ এবং বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের নাম রয়েছে।

বুধবার বিকেলে রাজধানীর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে বাংলাদেশ ন্যাশনাল কমিশন ফর ইউনেস্কোর সচিব মঞ্জুর হোসেন শীতলপাটির এ স্বীকৃতির খবরটি জানান। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ বিশ্ব ঐতিহ্যের দলিল হিসেবে ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়া উপলক্ষে ওই অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। ইউনেস্কোর ওই তালিকায় শীতলপাটির পাশাপাশি বিশ্বের আরও আটটি ঐতিহ্যকে যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া, ইউনেস্কোর ইনটেনজিবল কালচারাল হেরিটেজ ইন নিড অব আর্জেন্ট সেফগার্ডিং তালিকায় যুক্ত হয়েছে আরও ৬টি ঐতিহ্য।

ইতোপূর্বে ২০০৮ খ্রিস্টাব্দে বাংলাদেশের বাউল গান, ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে জামদানি বয়ন শিল্প এবং ২০১৬ খ্রিস্টাব্দে মঙ্গল শোভাযাত্রা ইউনেস্কোর নিবর্স্তুক ঐতিহ‌্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্তি লাভ করে। অতঃপর ইউনেস্কো বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চলের শীতল পাটি বুননের ঐতিহ্যগত হস্তশিল্পকে (Traditional art of Shital Pati weaving of Sylhet Bangladesh) কে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ নিবর্স্তুক সাংস্কৃতিক ঐতিহ‌্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।

তুলনা মুলক গরমের দিনে এর ব্যাবহার বেশি, কেননা এই পাটিতে শুলে শরীরে একরকম ঠান্ডা অনুভূতি হয়। তাই সাধারণত গরমকে নিবারনের জন্যে এই পাটি ব্যাবহার করা হয়। কিন্তু এখন এই পাটি বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে এবং এই পাটি দিয়ে অনেক কিছু তৈরি হচ্ছে,এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ব্যাগ ও বিভিন্ন ধরনের শিল্পা দ্রব্য। সূত্র: উইকিপিডিয়া।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

শীতল পাটি

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.1611 seconds.