• ১৯ অক্টোবর ২০১৭ ২১:১১:৩৮
  • ১৯ অক্টোবর ২০১৭ ২১:৪৩:০৯
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

রাইটার


শারমিন সুলতানা চৌধুরী


"তুমি আমার গল্পটা পড়ো তো, অনীশ",  অধরা এর প্রতিদিনের অনুরোধ!!
"বড় হলে পারবো না তো, তুমি জানো, আমি খেই হারিয়ে ফেলি".. অনীশের অসহায় সমর্পণ!
"বেশ, বড় করে লিখবোই না আর, চিরকুট লিখি, পড়বে?" অধরা খুব আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলো..
"হুম, চেষ্টা করবো। আর তোমার তো অনেক ভক্ত, আমি তো সাধারণ মানুষ। আমাকেই কেন পড়তে হবে!!"

অধরা জানে, অনীশ পছন্দ করে না লেখালিখি নিয়ে তার ব্যস্ততা। সামনে বই মেলা, প্রকাশকরা তাড়া দিচ্ছে, পাঠকরাও। তাও অনীশের কিছুই যায় আসে না।

অধরার মন খারাপ হয় খুব। তার ভালো লাগাকে, তার ভালো লাগার মানুষটা ছুঁয়েই দেখবে না? এ কেমন কষ্ট!! সে তো অনীশের প্রিয় মুভি একসাথে দেখে, প্রিয় জায়গায় বেড়াতে যায়। কি হয়, একদিন একটু সময় করে ওর লেখা পড়লে। ব্যস্তবাগীশ!!

"অনীশ, আমি বেরোচ্ছি। অফিসে দেরী হয়ে যাবে। তুমি নাস্তা না করে অফিসে যাবে না আর আমার ছোট গল্প টা পড়ো তো। থ্রিলার, তোমার জন্য লেখা, জানিও"
"তুমি হঠাৎ ট্রেক চেঞ্জ করলে কেন? আগের উপন্যাস টা শেষ? ওটার না পান্ডুলিপি দিতে হবে?"
"হুম, ইচ্ছে হচ্ছে না ওটা লিখতে"
"কেন? ওহ..রাইটার্স মাইন্ড!!  হুইমজিকাল!! রহস্য"

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো অধরা। রহস্য, একটাই। অনীশ, ও পড়েনা, তাই লিখতেও ইচ্ছে হয়না। দিন যাচ্ছে, দূরত্ব বাড়ছে। ওর জন্যই ওর মতো করে লিখছে। সে তো আর কিছু পারেনা। ইস, মেয়েলী গুণ গুলো ঈশ্বর তাকে যে কেন দেননি!! ছেলেরা পার্থিব সুখ গুলোই বুঝে হয়তো।

"অনীশ, আমার একটা বই এর প্রকাশনা কাল, শিল্পকলায়, আসবে তো?"
"মনে হয়না, আমি সহজ বোধ করিনা, অধরা। বারবার কেন বলো?"
"কেন? আমিই তো !!"
"জানিনা, তুমি যখন লেখো, ও সময়টা তুমি আমার থাকো না।"

স্তম্ভিত হয়ে গেলো অধরা। কি বলছে অনীশ?

রাতে কফি খেতে খেতে ল্যাপটপে কাজ করছিলো অনীশ। পাশে এসে বসলো অধরা..
"কফি কি বেশি কড়া হয়ে গেছে?"
"না তো, তুমি ভুল কিছু করো নাকি, তুমি তো অধরা, দ্যা পারফেক্ট!! "
"অনীশ, এভাবে বলছো কেন?"
"কেন বলবো না, বলো!! তুমি কি জানো, তুমি বাস্তবে জগতে থাকো না!!  যখন যেটা লিখো, সেই গল্পে বাঁচতে শুরু করো। ভেবে দেখো তো, তুমি সারাদিন বিড়বিড় করে চরিত্র গুলোর সাথে কথা বলো!! বুঝো, এটা পাগলামি!!"

"হা হা, এটা তো যারা লেখে, তাদের সাথে হয়। মিশে যাওয়া!! না হলে বুঝি লেখা যায়?"
"তাই? মানুষ বুঝি নিজের লেখা চরিত্রের প্রেমেও পড়ে?"
"অনীশ, কাল সকালে অফিস আছে। ঘুমোও তুমি"
"এড়িয়ে যাচ্ছো? দেখেছো?"
"না, এড়িয়ে যাচ্ছিনা। কিংবা যাচ্ছি, কষ্ট এড়াচ্ছি"
"বলো, তুমি অরিন্দমের প্রেমে পড়োনি?"
"তুমি পড়েছো গল্প টা?"
"প্রয়োজন নেই তো, সারাদিন ওই একজনের নামই শুনেছি, আমাকেও ক'বার অরিন্দম ডেকেছো, সে হিসেব আছে?"

কথা সত্যি। সে অরিন্দমকে ভালোবাসে, অনেক ভালোবাসে। কি অদ্ভুত!!  নিজের লেখা চরিত্র!!  তার প্রেমে পড়ে যাওয়া!!

কি অদ্ভুত সমীকরণ!! অনীশ... অরিন্দম!! না, এটা ছাড়তে হবে তার। গল্পটা শেষ আজ দু’মাস, সে কেন এখনো মায়া কাটাতে পারছে না।

না, তাকে সরে আসতে হবে!! ছোট গল্প গুলো বেশ। বেশি ভাবতে হয় না। একটা থিম ধরে লিখে যাও, বাকিটা পাঠকের দায়। কেমন যেন কূটবুদ্ধির ভাব আছে এটায়।

অসময়ে ফোনটা বেজে উঠলো ,অনীশ!!

"এই, তোমার 'গভীর গহীন'ই  ভালো ছিলো। এখন কি সব লিখছো, সবাই বলছে। তুমি নাকি আমার উপর রাগ করে এসব লিখছো। আসলেই বিষ মেশাবে নাকি?"
"কি জানি, মেশাতেও পারি। কল্পনা তো বাস্তব ছুঁয়েই আসে, জানো তো"
"তার মানে কি? অরিন্দম আছে সত্যি?"
"হুম, আছে। আমি ভালোবাসি ওকে"
"আমার বুঝা উচিত ছিলো, এটা রক্তমাংসের কেউ!  না হলে তুমি এতটা, পারলে?
"অনীশ, আজ একটু তাড়াতাড়ি ফিরবে? আমি অরিন্দমের ব্যাপারে বলতে চাই"

সন্ধ্যেয় ফিরে নিজেই ভড়কে গেলো অনীশ। মোমবাতি, হালকা আলো। অরিন্দম কে কি ডেকেছে ও?

তাদের ছোট বারান্দাটায় গিয়ে আরো অবাক হলো। কৃত্তিম ঘাস, হালকা আলো। অধরা দাঁড়িয়ে, হাতে ট্যাব। লাল পেড়ে সাদা শাড়ি..ভেজা চুলটা এলোমেলো।

"খুব বোরিং একটা কাজ করবো, অনীশ। তোমাকে গল্প পড়ে শোনাবো। অরিন্দমের.."
"কেন? এনে দেখাও? নাকি ওর সেই সাহসটা নেই?"
"আসবে তো। আগে তো আমি পরিচয় করিয়ে দেই। দাও না আজ রাতটা!!"
"বলো, কি বলবে!! বোরিং লাগলে কিন্তু শুনবো না"

হাসলো অধরা। মৃদু আলোয় পড়ে গেলো গল্প। জীবন ছুঁয়ে লেখা, কাছের মানুষটা তো বুঝুক। 

ভোর হয়ে গেলো, গল্প ফুরোতে ফুরোতে।

"অধরা, তুমি ভালো লেখো। শুধু ভালো না, আমি মুগ্ধ!! এবার তো অরিন্দমকে আনো"

চোখ ভরা জল নিয়ে হাসলো অধরা,
"যাহ!! মজা করেছি, এমন মানুষ হয় বুঝি? এত ভালোবাসে কেউ?"
"হয়, তুমি বাসো, অরিন্দমকে"

দীর্ঘশ্বাস ফেললো অধরা। তাও আজ পরিপূর্ণ সে। অনীশকে সে অরিন্দমের কথা বলতে পেরেছে।

দু'বছর পেরিয়ে গেলো। অনীশের খুব পছন্দের একটা কাজ, অধরার লেখা বই গুলো থেকে ধুলো ঝেড়ে রাখা। কতবার করে যে বইগুলো সে পড়ে, হিসেব ও নেই। কাল সাহিত্য পুরষ্কার ঘোষণা হয়েছে। "গভীর গহীনে"কত বড় সম্মান। অথচ অধরা চায়নি এটা বই হোক। সে শোনেনি। একটাই কষ্ট, মানুষটা দেখলো ও না। 

অনীশ কখনোই বুঝেনি, অরিন্দম সেই। তাঁকে নিয়ে যত ইচ্ছে, স্বপ্ন সবকিছু নিয়েই অরিন্দম!! শেষ চিরকুটটায় অধরা তাই লিখে গেছে। 

"অরিন্দম আছে, অনীশ!! এতটাই কাছে যে, তুমি ও বুঝোনি। জানো, দিনের পর দিন ভেবেছি, তুমি হয়তো একদিন বলবে, বোকা মেয়ে, মুখে বললেই হয়, কেউ বুঝি এভাবে বলে!! কেউ বলে না, অনীশ। তোমার জন্য আর কেউই বলবে না। তুমি শুনেও বুঝলে না, অরিন্দমকে!! অবিশ্বাস করলে!! পারলাম না আর। এই গল্পটা চিরকুটই ধরে নিও। যেমনটা তোমার বুকপকেটে গুঁজে দেই, বুকেই না হয় রেখে দিও!"

কেন জানিনা, ধুলোও জমে না ওর বই গুলোতে। তাও ছুঁয়ে যায় অনীশ, তাতেও যদি অধরাকে একটাবার ধরা যায়!!!

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0273 seconds.