• বিদেশ ডেস্ক
  • ১১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ২২:৩৫:৪০
  • ১২ সেপ্টেম্বর ২০১৭ ১২:২৮:৫৫
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

রোহিঙ্গা গণহত্যা: করপোরেটবাদিতা, ভূ-রাজনীতি ও ওয়াহাবিবাদের সম্পর্ক

ছবি: সংগৃহীত

মিয়ানমারে চলমান রোহিঙ্গা গণহত্যা বিষয়গুলোকে নানাভাবে বিশ্লেষণ করছেন আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা। গণহত্যা, সহিংসতার মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে শরণার্থী হয়ে এসেছে বাংলাদেশে। এ ঘটনায় নিন্দা-প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন সংস্থা ও আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বরা। কিন্তু এরপরও কমছে না এই সহিংসতার মাত্রা। কিন্তু কেন? সে বিষয়ে বিশ্লেষন করেছেন মার্কিন লেখক ও গবেষক ক্রিস কাথান।

ক্রিস কাথান ‘ডিকনস্ট্রাকটিং মনস্যানতো’ নামের ই-বুকের লেখক। সান ফ্রান্সিকোর বাসিন্দা ক্রিস কাথান ৩০টিরও বেশি দেশে ভ্রমন করেছেন। তিনি মূলত রাজনীতি অর্থনীতি ও খাদ্যবিষয়ক লেখালেখি করেন।

মিয়ানমারের সহিংসতা নিয়ে তার বিশ্লেষনধর্মী লেখাটি প্রকাশ করা হলো-

মিয়ানমারে চলমান অমানবিক সহিংসতায় গত কয়েক মাসে প্রায় দেড় লাখ মুসলমান রোহিঙ্গা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। মুসলমান রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের বৌদ্ধদের এ সহিংসতা কয়েক দশক ধরে চলে আসলেও জাতিগত শুদ্ধির এ সহিংসতার গল্প অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। মূলধারার গণমাধ্যম  ধর্মীয় প্রেক্ষাপটের ক্ষেত্রেই বিশেষভাবে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করছে। কিন্তু এর বাইরে যে দেশটিতে তেল/গ্যাস পাইপলাইনের ভূমিকা, যুক্তরাষ্ট্র-চীনের ভূরাজনৈতিক যুদ্ধ এবং সৌদি আরবের ভিন্ন ধরনের ভূমিকা রয়েছে সেটা মনে হয় এসব গণমাধ্যম ইচ্ছাকৃতভাবেই এড়িয়ে গেছে।

ফলে গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়গুলো ওই ধর্মীয় সহিংসতার মধ্যেই হারিয়ে গেছে। আসুন বিষয়টি  স্পষ্ট করে ব্যাখা করি। পশ্চিমা গণমাধ্যম মিয়ানমারের মতো দূরবর্তী এরকম কোনো জায়গার মামুলি কিছু মানুষের জন্য মায়া কান্না কখনই করবে না। তবে গোপন কোনো স্বার্থ বাস্তবায়ন, কোটি কোটি ডলার বা স্বয়ং রাষ্ট্রের কোনো চাওয়া থাকলে সেটা ভিন্নকথা। তবে আলোচনায় যাওয়ার আগে মিয়ানমার সম্পর্কে কিছু মৌলিক তথ্য জানা থাকা দরকার।

মিয়ানমারের পূর্বে নাম ছিলো বার্মা। এটি দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম দেশ। মিয়ানমার একটি গরীব রাষ্ট্র। গত কয়েক দশক ধরে বহির্বিশ্বের সাথে দেশটির তেমন কোনো যোগাযোগই ছিলো না। তবে কৌশলগত কারণে এটি চীনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সেখানে তাদের নতুন সিল্ক রোড শুরু হয়েছে।

মিয়ানমার একদিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বৃহত্তম দেশ, অন্যদিকে এই অঞ্চলের সবচেয়ে দরিদ্র রাষ্ট্রও এটি। কৌশলগত কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দেশটি কয়েক দশক ধরে সামরিক সরকারের অধীনে ছিলো। যদিও বর্তমানে গণতান্ত্রিক সরকার রয়েছে। দরিদ্র হলেও ১৯৯০ সালের পর থেকে এর অর্থনীতি সামনের দিকে এগোতে শুরু করে। ২০০৬ সালের পর এখানে ব্যাপক বিদেশি বিনিয়োগ হতে থাকে। কারণ দেশটিতে প্রাকৃতিক সম্পদ বিশেষ করে প্রাকৃতিক গ্যাস, তেল, টিন, রাবার, স্বর্ণ, ধাতবসহ বিভিন্ন খনিজ পদার্থের বিপুল মজুদ রয়েছে। আর এজন্য পরিবেশ দূষণ, সাধারণ মানুষদের ভূমি থেকে উচ্ছেদ অব্যাহত আছে।

বর্তমানে মিয়ানমারের পশ্চিমাঞ্চলে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর সহিংসতা চলছে। আর যেসব অঞ্চলে রোহিঙ্গারা বসবাস করে, সেইসব অঞ্চলের পাশেই বাংলাদেশ অবস্থিত, যাদের অধিকাংশ জনগোষ্ঠীই মুসলিম। রোহিঙ্গারাও মুসলিম হওয়ায় মিয়ানমার চাচ্ছে, তারা ওই অঞ্চল খালি করে বাংলাদেশে স্থানান্তরিত হোক। মিয়ানমারের দাবি, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশ থেকে এসেছে। যদিও ব্রিটিশরা ভারতীয় উপমহাদেশে উপনিবেশ স্থাপন করলে ১৯ শাতাব্দী থেকেই রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার অঞ্চলে বসবাস করতে দেখা যায়।

করপোরেটবাদিতা

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে নানাভাবে ঘিরে রেখেছে সমুদ্রবর্তী ও সমুদ্র তীরবর্তী তেল-গ্যাস ক্ষেত্রগুলো। মিয়ানমারের সমুদ্র থেকে গ্যাস উত্তোলনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম বৃহৎ প্রতিষ্ঠান শুই প্রজেক্ট। চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া ভিত্তিক শুই প্রজেক্টের নিয়ন্ত্রণাধীন সমুদ্র উপকূলবর্তী এলাকা সংলগ্ন অঞ্চলগুলোয় রোহিঙ্গাদের বাস। ওই অঞ্চলে চীন গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের যে স্বপ্ন দেখে, সেটা থেকেও তারা খুব বেশি দূরে নেই। মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে তেল ও গ্যাস পাইপলাইন তৈরি করেছে চীন, তারা চায় সেটা আরো বিস্তৃত করতে।

শুধু চীন নয়, যুক্তরাষ্ট্র, ফ্রান্স, কানাডা, জাপান, ভারতসহ অনেক দেশের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান মিয়ানমারে কাজ করছে। যারা মিয়ানমারের বিভিন্ন অঞ্চল ঘিরে রেখেছে। বিভিন্ন দেশ ও করপোরেট প্রতিষ্ঠান যখন মিয়ানমারে তেল ও গ্যাস উত্তোলন করতে বড়ো বড়ো স্থাপনা, সমুদ্রবন্দর, রেল-মহাসড়ক এবং বিদেশি কর্মীদের থাকার জন্য বিলাসবহুল হোটেল নির্মাণ করতে চায়, তখন কীসের প্রয়োজন পড়ে? খুব স্বাভাবিকভাবেই বলা যায়, সেখানে যে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বসবাস তাদেরকে সেখান থেকে বিতাড়িত করার প্রয়োজন দেখা দেয়। তখন করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো ওই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আইনী চাপ সৃষ্টি করে। সারা বিশ্বেই এমনটা হয়ে থাকে।

দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে একটা শ্রেণি থাকে যারা তাদের ভিটামাটি ছেড়ে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। বিশেষ করে কৃষক ও জেলেরা, কারণ এই শ্রেণির জীবন-জীবিকা নির্ভর করে সেখানকার ভূমি ও পানির ওপর। দ্বিতীয় আরেকটি শ্রেণি থাকে, যারা করপোরেট প্রতিষ্ঠানের দেওয়া টাকা নিয়ে স্বেচ্ছায় অন্য জায়গায় চলে যায়। উদাহরণ হিসেবে মিয়ানমারের আইনের কথা বলা যেতে পারে। সেখানে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বলা হয়েছে, উচ্ছেদ করতে হলে প্রত্যেক ব্যক্তিকে ১ হাজার মার্কিন ডলার দিতে হবে। ১ লাখ মানুষের ক্ষেত্রে এই হিসাব করলে অর্থের পরিমাণ দাঁড়ায় ১০০ মিলিয়ন ডলার।

মিয়ানমার থেকে যেসব রোহিঙ্গা সরে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে তাদেরকে দেশটির আইনে যে পরিমাণ টাকার দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে তার চেয়ে বেশি দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো। বর্তমানে মিয়ানমারের রাখাইনে যে সহিংসতা চালানো হচ্ছে, তাতে আরো অনেক কম খরচে তারা রোহিঙ্গাদের ওই অঞ্চল থেকে বিতাড়িত করছে।

ভূ-রাজনীতি

চীন সরকারের দুটি লক্ষ্য, মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে তেল-গ্যাসের মতো খনিজ সম্পদ আনা-নেওয়ার জন্য পাইপলাইন তৈরি করা এবং গভীর সমুদ্রবন্দর তৈরি করা। প্রথমটি ইতোমধ্যে অনেকটাই সম্পন্ন হয়েছে। মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে তারা গ্যাস আমদানি করছে। দ্বিতীয় লক্ষ্যে পৌঁছানোটা একটু জটিলই চীনের জন্য। এক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ।

এক.

মধ্যপ্রাচ্য ও সংশ্লিষ্ট অঞ্চল থেকে সমুদ্র পথে যে তেলবাহী টেঙ্কার ও কার্গোগুলো আসবে সেগুলো চীন মিয়ানমারের ওই সমুদ্রবন্দরে নামাতে পারবে। এই জন্য চীনকে সংক্ষিপ্ত রুট তৈরি করতে হবে, যাতে পুরো দক্ষিণ এশিয়া ঘুরে আসতে না হয়। আর এটা করা সম্ভব হলে দুই হাজার মাইল পথ কমে যাবে, যা সমুদ্রপথে যেতে বা আসতে লাগে দুই সপ্তাহ।

দুই.

দক্ষিণ চীন সাগরের ওপর চীন তাদের নির্ভরশীলতা কমাতে চায় চীন। বিশেষ করে মালাক্কা অঞ্চলে। যুদ্ধ লাগলে বা কোনো বিরোধিতা দেখা দিলে যেকোনো সময় ওই অঞ্চলে চীনের যাতায়াত বন্ধ হয়ে যেতে পারে। আর সেই যুদ্ধে জড়িয়ে যেতে পারে চীনের প্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্রও।

তিন.

চীন যে সিল্ক রোডের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রও সেদিকে নজর রাখছে। এক্ষেত্রে দুটি দেশের ক্ষেত্রেই মিয়ানমারের কোনো বিকল্প নেই। উইকিলিকের ইমেইল ফাঁস থেকে জানা যায়, মিয়ানমারের তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠনগুলোকে চীনের সিল্ক রোড পরিকল্পনা ভণ্ডুল করে দিতে ব্যাপক অর্থায়ন করছে সিআইএ। সেখানে তারা বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করছে। এডওয়ার্ড স্নোডেনের ফাঁস করা তথ্য থেকে আরো জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা এনএসএ মিয়ানমারে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস ব্যবহার করছে। সেখান থেকে তারা এই অঞ্চলের দেশগুলোর ব্যাপারে নাক গলানোর চেষ্টা চলাচ্ছে।

চার.

যুক্তরাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য মিয়ানমারকে চীনের প্রভাব থেকে মুক্ত করা। আর সেজন্য মিয়ানমারে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

পাঁচ.

মিয়ানমারকে অস্থিতিশীল করতে সিআইএ ইসলামী জঙ্গিবাদসহ বিভিন্ন মৌলবাদী প্রকল্প হাতে নিয়েছে, যেমনটি আমরা সিরিয়ায় দেখেছি। অতি সম্প্রতি আমরা ফিলিপাইনেও দেখতে পাচ্ছি। আর সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের ‘পুতুল রাষ্ট্র’ হিসেবে সৌদি আরব কাজ করছে।

সৌদির ওয়াহাবিবাদ

সৌদি আরব দুটি বিষয় রপ্তানিতে শীর্ষে অবস্থান করছে- তেল আর ওয়াহাবিবাদ। সৌদি ওয়াহাবিবাদে আক্রান্ত এশিয়ান দেশগুলোর মধ্যে একটি বাংলাদেশ। যেখানে সম্প্রতি জঙ্গিবাদ বিস্তার লাভ করেছে। গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকজন প্রগতিশীল লেখক ও ব্লগারকে খুন করেছে জঙ্গিবাদীরা। আইএস ও অন্যান্য ইসলামী জঙ্গিগোষ্ঠী বাংলাদেশে বিদেশিদের খুন করেছে, যাদের মধ্যে তিনজন আমেরিকানকে গলা কেটে হত্যা করা হয়েছে। উগ্রবাদীরা গির্জা ও বৌদ্ধ মন্দির ভেঙে দিয়েছে। বাংলাদেশে যখন এভাবে মৌলবাদ চাড়া দিচ্ছে, ঠিক ওইরকম একটা সময়ই মুসলিম রোহিঙ্গারা দেশটিতে প্রবেশ করছে।

রোহিঙ্গা বিদ্রোহী/জঙ্গিবাদী/সন্ত্রাসী গোষ্ঠী ইসলামিক রাষ্ট্র দাবি করছে। এবং তারাই মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ওপর হামলা করেছে, পুড়িয়ে দিয়েছে বুদ্ধ মন্দির, হত্যা করেছে বুদ্ধদের প্রভৃতি। শক্তিশালী রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী সংগঠন ‘আতা উল্লাহ’ সৌদি আরব ভিত্তিক। আর বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকেও রোহিঙ্গা বিদ্রোহীরা প্রশিক্ষণ নিয়েছে, নিচ্ছে। তাছাড়া শরণার্থী দরিদ্র ও অশিক্ষিত রোহিঙ্গাদের হাতে অস্ত্র তুলে দেওয়া খুব সহজেই সম্ভব। কারণ বাংলাদেশে ৩০ থেকে ৪০ মিলিয়ন মানুষ আয় করে দৈনিক ২ ডলারের কম।

বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রিত গণমাধ্যমগুলো মিয়ানমার ইস্যুতে খুবই স্পর্শকাতরভাবে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। অথচ ওখানে অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন দরকার, যার মধ্য দিয়ে মিয়ানমারে যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে এবং রোহিঙ্গা সমস্যার মূল বিষয়গুলো উঠে আসবে।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0179 seconds.