• ৩১ আগস্ট ২০১৭ ১৩:০৭:৪৬
  • ৩১ আগস্ট ২০১৭ ১৩:০৭:৪৬
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
সংশ্লিষ্ট দংশন
বিজ্ঞাপন

শেষ পর্ব

দংশন


মিমি হোসেন


দুপুর বারোটা না গড়াতেই আজকাল চোখ ঘুমে জড়িয়ে আসে নীরার। অফিসের ফাইল গুলোর দিকে ঝাপসা চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মাথা নুয়ে আসে তার। গত তিন মাস যাবৎ এই অকারণ অলসতা পেয়ে বসেছে নীরাকে। খুব অকারণ বললে ভুল বলা হবে। আবিদ আর তার কথার পিঠে কথার কথোপকথন মধ্যরাত গড়িয়ে মাঝে মাঝে সূর্যের মুখ দেখে তবু কথা ফুরোয় না তাদের।

অনলাইনের পরিচয় চ্যাটিং তা থেকে ভালোলাগা কখন যে এতটা কাছাকাছি নিয়ে এসেছে আবিদকে নীরা বুঝতে পারেনি। এ অবধি দুবার তারা দুটো কফি শপে দেখা করেছে। বাইরে খুব অল্প সময়ের জন্য দেখা হলেও আজই প্রথম আবিদ তাকে অনুরোধ করছিলো এক বন্ধুর নিমন্ত্রণে যাবার জন্য। আবিদের প্রতি একটা আকর্ষন থেকে নীরা না করতে পারেনি আর। সন্ধ্যায় আবিদের হোস্টেল এ আসবার কথা তাকে নিতে।জায়গাটা দেখেই নীরার মনে প্রশ্ন আসতে লাগল।

-- এখানে সব কিছু এমন কেনো! দেখে মনে হচ্ছে কেও কাওকে চেনে না যেনো!
-- তুমি নতুন তাই এমন মনে হচ্ছে, মাঝে মাঝে আমার সাথে আসলে তোমার অভ্যাস হয়ে যাবে।
-- তুমি এদের সাথে প্রায়ই আসো? তুমি ড্রিংক করো আগে বলোনি তো!
-- সব কিছু আগে বলে দিলে চার্ম পেতে কোথায়! এত বুঝতে চেও না, এঞ্জয় করতে এসেছো করো।
হটাৎ করেই আবিদকে অচেনা মনে হলো নীরার। এমন নরম করে কথা বলা ছেলেটাকে সম্পূর্ণ অপরিচিত লাগল তার। কিছুক্ষণ পর সে দেখল আবিদ একটি খুব সুন্দরী মেয়ের সাথে বেশ অন্তরঙ্গ হয়ে কথা বলছে, তাদের দুজনের হাতে দুটি গ্লাস।

নীরার ধৈর্যের বাধ ভেঙ্গে গেলো সে বেশ রাগের সাথেই আবিদ এর পাশে গিয়ে জোড় গলায় বলল,
-- আমি হোস্টেল এ যাবো, এক্ষুনি। আমাকে দিয়ে আসো।
-- যেতে চাচ্ছ যাও, আমি তোমাকে ধরে রাখিনি তো! তবে যাবার আগে আমাদের কি কিছুক্ষণ একা থাকা উচিৎ নয় মাই ডিয়ার!

আবিদের অর্থপূর্ণ আহ্বান সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে নীরা দরজার দিকে পা বাড়ালো।
নীরা ভেবেছিলো আবিদ এত রাতে তাকে একা কিছুতেই যেতে দিবেনা। কিন্ত আবিদ নীরার দিকে ফিরেও দেখলো না।

নীরা ঘড়ি দেখল, রাত পৌনে দুটা বাজে। সে বুঝতে পারছিলো না কি করবে! কত বড় ভুল সে করতে যাচ্ছিলো। বুক ফেটে কান্নার দমক তার গলার কাছে আটকে আছে যেন। আগুপিছু না ভেবেই নীরা নীচে নেমে আসল। সে কিছুই জানে না কিভাবে পৌঁছবে হোস্টেলে তবু এই নরকে আর না।
বাড়িটা থেকে বেরিয়ে কিছুদুর যেতেই পেছন থেকে কে একজন ডেকে উঠল,

-- এই যে আপা এত রাতে কোথায় যান! বনিবনা ঠিক হয় নাই নাকি! আমার সাথে আসলে ঠকবেন না কিন্ত!

নীরার মাথা ঘুরে উঠলো যেনো। লোকটা কি বলছে এসব! সে যেই মুখ খুলবে কিছু বলবে বলে ওমনি অন্য একটি কন্ঠস্বর বলে উঠল-

-- ধর শালারে! আর এই যে ম্যাডাম এত রাতে এখানে কি করেন!
-- জ্বি , আমি ভুলে এখানে চলে এসেছি।
-- এখানে সবাই ভুলেই আসে বুঝলেন?
-- আমি সত্যি বলছি, এসবের কিছুই আমি জানতাম না, আমার বন্ধু আমাকে মিথ্যে বলে এখনে নিয়ে এসেছে।
--তাই নাকি, কয়জন বন্ধুর সাথে এসেছেন আজ?
-- মানে! একজন, সে ভেতরে আছে, আমি তাকে ফোন করে দিচ্ছি আপনারা কথা বলেন প্লিজ।
কথা পরে হবে এখন থানায় চলেন আগে, এই ম্যাডামরে গাড়িতে উঠা। 

নীরা কিছু বলবার আগেই হটাৎ দেখল গেট থেকে নাফিদ বেরিয়ে আসছে, তার পুরোনো অফিস সহকর্মী। সে যেন প্রাণ ফিরে পেল। তার কাছে সমস্ত লজ্জ্বা ভেঙ্গে সে ঘটনার বর্ননা দিলো। 

-- হ্যালো, রাজীব ভাই আমি রাফি। ভাই বিরক্ত করছি, একটা বিপদে পড়ে ফোন দিয়েছি ভাই।
-- কিরে রাফি কই তুই! কি হইসে?
রাফি সব খুলে বলার পর রাজীব ভাই যা বলল তা হলো
-- ফুর্তি করতে আসছিস ফুর্তি কর,  এই পুলিশি ঝামেলায় পড়িস না আমারেও জড়াইস না, এই দুই পয়সার মেয়েমানুষ এর জন্য আমি আমার নাম খারাপ করব নাকি!

রাফি আর নাফিদ তখন থেকেই কন্সটেবল গুলোকে বোঝাতে চাচ্ছিল যে মেয়েটা নিরপরাধ।
কিন্ত তারা কিছুতেই মানবে না সে কথা।  
এক পর্যায়ে তাদের একজন নিজেদের রুপে অবতীর্ণ হলো।
-- এক লাখ ছাড়েন বান্ধবী রে নিয়াযান।
-- ভাই এই মেয়ে এতটাকা কোথায় পাবে এত রাতে!
--আরে এদের আবার টাকার অভাব আছে নাকি! কি যে কন! জামা কাপড় নাড়া দিলেই এদের কাছ থেইকা টাকা ঝইরা পরে। 
-- আপনারা বুঝতেছেন না মেয়েটা ভদ্র ঘরের।
-- ঠিক আছে, আপনারা টাকা দেন তবে!
-- এত টাকা তো আনিনি সাথে!
এতক্ষণ নীরা কিছুই বলতে পারেনি, দাঁড়িয়ে চোখ মুছে গেছে শুধু।
-- ঠিক আছে তারে ছাড়তে পারি এক শর্তে।
-- কি শর্তে
-- সে এখানে যেই কাজে আসছে সেই কাজ শেষ হলে তাকে ছাইড়া দিবো আমরা। কোনো পক্ষেরই লস নাই। 
বলেই বিচ্ছিরি ভাবে লোক গুলো হেসে উঠল।

এর মধ্যে একজন মোবাইলে ফোন দিলো। এর কিছুক্ষণের ভেতরেই একটা জীপ এসে দাঁড়ালো তাদের পাশে।
-- আপনারা শিক্ষিত মানুষ, দিনে অফিস আদালত ব্যাংকিং ভার্সিটি করেন আর রাতে সব পর্দা নামায় দেন! আরে ভাই দিনের আলোয় সব পাপ সাফ হইয়া যায় তাই না! যান ঝামেলা করবেন না। লাভ হবে না, নাহলে সাংবাদিক ডেকে ম্যাডামের ছবিসহ নিজেদের কাল পত্রিকার প্রথম পাতায় পাবেন।
সমস্ত অনুরোধ উপেক্ষা করে নীরাকে তারা জীপে তুলে নিয়ে গেলো। 

সে আর নাফিদ কতক্ষণ অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ছিলো বলতে পারবে না। একটা অস্পষ্ট রাতের গ্লানি নিয়ে কন্ঠনালী পর্যন্ত নিজেদের ডুবিয়ে তারা ঘরে ফিরেছিলো সেইদিন।

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

দংশন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0234 seconds.