• ১২ আগস্ট ২০১৭ ১৫:২৯:৫৩
  • ১২ আগস্ট ২০১৭ ২১:২০:০৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

করিমন

ফারহানা কলি, ছবি: সংগৃহীত


ফারহানা কলি


বাঁশের খুঁটির সাথে ছাতাটা শক্ত করে দড়ি দিয়ে বেঁধে কাঠের পিড়িতে বসে, কোমরে গোঁজা আটপৌরে কাপড়ের আঁচল থেকে বিড়িটা বের করে এদিক ওদিক দেখছে করিমন। সামনের লোকটিকে কিছু বলতেই সে উঠে এসে করিমনের বিড়িটা হাতে নিয়ে নিজেরটা থেকে আগুন ধরিয়ে দিয়ে আবার নিজের জায়গায় ফিরে গেল। করিমন চোখ দুটো বন্ধ করে এতো জোরে বিড়িতে টান দিল যে দেখে মনে হচ্ছে সুখের নি:শ্বাস নিচ্ছে।

পাশের বাড়ীতে প্রথম যখন ইট ভাঙার কাজ শুরু করে, ঠাস ঠাস আওয়াজে বিরক্ত লাগত। ইদানীং কেমন যেন গা সহা হয়ে গেছে। সব কিছুই এক সময় মানুষের সহ্য হয়ে যায়। দুপুরের স্নান সেরে বারান্দায় চুল শুকাতে দাঁড়িয়েছি, তখনই চোখ পড়ল নিচের মানুষগুলোর উপর।

কয়েক দিন থেকেই বারান্দায় বসে, চা খেতে খেতে করিমনকে দেখছিলাম। জীর্নশীর্ন শরীরে আটপৌরে কাপড়ে নিজেকে পেঁচিয়ে এক মনে ইট ভাঙছে। মেয়েদের ষষ্ঠ ইন্দ্রীয় নামের যে ব্যাপার আছে তাতেই হয়ত, করিমন হঠাৎ উপরে তাকিয়ে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলল, আফা কিছু কইছুন?

হঠাৎ প্রশ্নে আমি হকচকিয়ে গিয়েছিলাম । বললাম, কই কিছু নাতো।

ঠিক পরক্ষণেই মনে হলো ডাকিই না এক কাপ চা খেতে। তাই হাতের ইশারায় উপরে আসতে বললাম।  
সামনে বসা লোকটাকে আবার কিছু বলে করিমন উঠে আসছে। আমিও উঠে গিয়ে চুলায় চায়ের পানিতে চা পাতা দিয়ে, দরজায় গিয়ে দাঁড়ালাম। দরজায় বেল দিতেই দরজা খুলে দিয়ে বললাম, ভেতরে এসো।

ভেতরে ঢুকেই করিমন বলল, আহা! কি সুন্দর বাসা। আফা আফনে একলা থাহুইন?
বললাম না, বসো।

বলতে না বলতেই করিমন নিচে কার্পেটে বসে পড়ল।  
এই কর কি! কর কি! উপরে বস।
না আফা আমার শইল্লে ময়লা। আফনের সব ময়লা অইয়া যাইব। 
হবে না, তুমি বসো। 
আফা আমরা গরীব মানুষ নিচে আরাম কইরা বইতাম পারি। বলেই নিচে কার্পেটে বসে পড়ল। 

আচ্ছা বসো। 
তোমার নাম কি?
বাপ মায়ে নাম রাখছিল করিমন। হগ্গলে তাই ডাহে। আমার এই দুইন্নায় কেউ নাই গো আফা। স্বোয়ামী বছর ঘুরতেই আরেক বেটির লগে গেছুইন গা। কয় তুই বন্ধ্যা মাইয়া মানুষ। তোরে দিয়া কিয়ের সংসার। হের পর কতো বেডাইন আইছুন বিয়া করতে। মনডা চায় না। ছুডু পোলাপাইন না অইলে হেয়ও .......দীর্ঘশ্বাস নিয়ে করিমন বলতে থাকে। আমার মনটাও খুব খারাপ হয়ে গেলো। মনে মনে ভাবছি, এতো বড় দুনিয়ায় একটি মানুষ একদম একা কি করে থাকে। বাচ্চা হয় না তাই স্বামী ছেড়ে চলে গেছে!

চায়ে চিনি কতো টুকু দিব করিমন? 
দেন আফা মিস্টি অইলেই অয়।  
দু'কাপ চা বানিয়ে এক কাপ করিমনের দিকে দিতেই, চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। কি হলো জানিনা চোখ বেয়ে পানি পড়ছে করিমনের। আঁচলের কোনায় চোখের পানি মুছে হাত থেকে চায়ের কাপ নিয়ে। দু'চোখ বন্ধ করে হুসসস...শব্দ করে চায়ে চুমুক দিচ্ছে।  

আহ! দেখে মনে হচ্ছে, জীবনের মানেটা আসলে কি? জানিনা করিমন যে সমাজের মানুষ সেখানে না হয় মানুষ গুলো এই রকমই। লেখা পড়া জানে না। জ্ঞানের অভাব। বাচ্চা না হলে এদের জীবনে অনেক কথা হয়। কিন্তু আমাদের কথিত ভদ্র সমাজেও কি তা হয় না? হয়, হচ্ছে। লেখা পড়া জানা মানুষ গুলো সহজেই বলে দেয় বাচ্চা হয় না, মেয়ের সমস্যা। মেয়ে হলো কেনো? মায়ের দোষ। বাচ্চা না হলে বংশ রক্ষা হবে না। আরো কতো কি? 

এই তো কতো দিন আগে একজন ব্যক্তি আমাকে বলছিলো, তোমার তো দুটো মেয়ে। আর একটা বাচ্চা নাও। এবার হয়ত ছেলে হবে। আমার প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ হয়েছিল। তাই উত্তরটাও অবশ্য একটু কঠিনভাবে দিয়েছিলাম। বাচ্চা ছেলে আর মেয়েতে আমার কাছে কোন ভেদা-ভেদ নেই। আমার মা সব সময় একটা কথা  বলে, মেয়েরা বাবা-মায়ের কথা যতো বার মনে করে, ছেলেরা তার অর্ধেকবারও মনে করে না। আমার পরিবারেও আমি ছেলেদের চেয়ে অনেক বেশি প্রাধান্য পেয়েই বড় হয়েছি। দু'জন মানুষ এক সাথে সংসার করার জন্য সবচেয়ে বেশি দরকার ভালবাসা আর বিশ্বাস।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0209 seconds.