• ০৩ আগস্ট ২০১৭ ২২:১২:২৮
  • ০৩ আগস্ট ২০১৭ ২২:১২:২৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
সংশ্লিষ্ট ঘেন্না
বিজ্ঞাপন

শ্যাওলা জীবন

স্মৃতি ভদ্র। ছবি : সংগৃহীত


স্মৃতি ভদ্র


সবুজ রঙের পুকুরজলে চোখ ডুবিয়ে বসে আসে নিরু। একটা জলফড়িং জলে কিঞ্চিৎ তরঙ্গ তুলেই পালিয়ে গেল। খুব অল্পসময়েই তরঙ্গ থামিয়ে পুকুরটা শান্ত হয়ে গেলো ঠিক যেন ধ্যানমগ্ন ঋষি। পুকুরপাড়ের জামগাছের শুকনো একটি ডাল পড়ে আছে ডাঙা আর জল ছুঁয়ে নির্বিকার। একটি হলদে রঙের কুটুমপাখি সেই কখন থেকে ডালটাতে বসে শিস দিয়ে চলেছে। কুটুম আসবে আজ। কিন্তু নিরুর বুকের ভিতর কেন যেন আজ ডাহুকের ডাক। খুব বিষণ্ণ। 

মা এসে এরমধ্যে একবার ডেকে গেছে। "আসছি" বলেও চুপচাপ বসেই আছে। আজ মা খুব ব্যস্ত। সকাল থেকেই শুরু হয়েছে তার রান্নার আয়োজন। বাবা প্যারালাইজড হবার পর থেকেই বাড়িটা খুব প্রাণহীন। ভাইজান পাশের উপজেলায় একটি এন.জি.ও তে চাকরী করে। তাই ভাবীকে নিয়ে সেখানেই থাকে। বাড়িতে মা আর প্যারালাইজড বাবা। একসময় ভাইজান আর নিরুর হৈ হুল্লোরে বাড়িটা খুব প্রাণময় ছিল। বাবা চাকরি করতেন একটি স্পিনিং মিলে। অল্প সবকিছু নিয়েই খুব ভাল ছিল ওরা। এখনো নিরুর মনে পড়ে বাবা যখন সাইকেলের বেল বাজিয়ে দরজায় এসে দাঁড়াতো তখন দুই ভাইবোন দৌড়ে যেত বাবার কাছে। এরপর ভাইজান আর নিরুকে সাইকেলে বসিয়ে বাবা গলির মাথা পর্যন্ত ঘুরিয়ে আনতো। সাইকেলের চাকার ঘূর্ণন দেখতে দেখতে নিরু সুখের হিসেব কষতো।

বাবা আজ প্রায় পাঁচ বছর ধরে বিছানায় পড়ে আছে। আর এজন্যই নিরুকে পড়াশুনা শেষ করার আগেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়েছে। নিরু তখন বি,এ প্রথম বর্ষ। নিরুর বড় চাচা এই বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে আসে। ছেলে অনেকদিন সৌদিতে ছিল। যদিও বয়স একটু বেশী। তবে প্রচুর টাকা আর সোনাদানা নিয়ে এসেছে।দেশে এসেছে বিয়ে করতে। বিয়ের পর বউ নিয়ে আবার সৌদি ফিরবে। এমন সুপাত্র কোনোভাবেই জড়াগ্রস্ত পিতার কন্যা আর বেকার ভাইয়ের বোন আপত্তি করতে পারে না। তাই খুব স্বল্প আয়োজনে কোনো এক জুম'আ বারে সৌদি থেকে আনা গহনা আর মায়ের জমানো টাকায় কেনা বেনারসিতে নিজেকে সাজিয়ে নিরু পা বাড়ায় নতুন জীবনে। 

নতুন জীবনে সবকিছু নতুন। নতুন সম্পর্ক, নতুন নিয়ম, নতুন স্বপ্ন। খুব অদ্ভুতভাবে দিনগুলোও আস্তে আস্তে নতুন হতে শুরু করলো নিরুর। যে দিনে থাকত না আলোর দ্যুতি। তমসাবৃত এক একটি দিন। নিরুর স্বামী বিদেশ ফেরত তাই বন্ধুমহলে তার খুব সমাদর। রাত মধ্য না হলে বন্ধু মহলের খাতিরদারি শেষ হত না। তাই প্রতিদিন নিরুর স্বামী মধ্যরাতে ঘরে ফিরতো। আবার কখনো বন্ধুদের কথা ফেলতে না পেরে একটু আধটু মদ খেয়ে ঘরে ফিরতো। আর নিরু কিছু বলতে গেলেই "তুমি বউ মানুষ, চুপ থাকো " না হলে হাতে পিঠে কালশিটে দাগ উপহার। এরপর ব্যবসা করতে হবে সৌদির অবস্থা ভাল না আর ফেরা যাবে না। তাই বিয়ের গয়নাগুলো একে একে নিরুকে ছাড়তে হলো। কিন্তু নিরুর স্বামী ব্যবসা বলতে যে জুয়াখেলাকে বুঝিয়েছে তা বুঝতেও নিরুর কয়েকমাস লেগে গেলো। এসব খুব নতুন ছিল নিরুর কাছে। এগুলো যখন নিরুর কাছে আস্তে আস্তে পুরাতন হতে থাকে, তখন বাচ্চা না হওয়ার গঞ্জনা নতুন কিছুর স্বাদ দিতে থাকে। আরোও নতুন ছিল চরিত্রহীনার তাজমুকুট। নিজের দেবরের সাথে সৌজন্য ব্যবহারটাও নিরুর স্বামীর কাছে ছিল নষ্ট মেয়েমানুষের লক্ষণ। 

প্রায় পনেরদিন নিরু বাবার বাসায় এসেছে। বাবার বিছানার পাশে যতবার গিয়ে দাঁড়ায় ততবার জড় বাবার সাথে সাথে নিজের জড়জীবন টার যোগসূত্র খুঁজেছে। মায়ের কোলে শুয়ে গল্পে গল্পে সবটা বলেছে।  অসহায় মা সব বুঝেও মেয়েকে বারবার ফিরতে বলে নিজের ঘরে। নিজের ঘর যে ওটা নয়, মা বুঝেও নিরুকে বারবার ফিরতে বলে। আজ একটু পড়েই নিরুর স্বামী আসবে নিরুকে ফিরিয়ে নিতে। সবকিছু নিরু গুছিয়ে নিয়েছে। আজ নিরু ফিরে যাবে। শ্যাওলা সবুজ একটি শাড়ি পড়েছে নিরু। বাতাসে মার আলু দিয়ে লাল করে মুরগীর মাংসের ঘ্রাণ। মার মনে হয় রান্না শেষ হয়ে এলো। আবার আসবে ডাকতে পুকুরপাড়ে। হঠাত পুকুড়ের পাশের বাতাবিলেবু গাছটা থেকে একটা বাতাবিলেবু ঝুপ করে পানিতে পড়ে পুকুড়ের শ্যাওলাগুলোকে ছিন্নভিন্ন করে তলিয়ে গেল। শ্যাওলাভাসা পুকুরটা খানিক পড়েই আবার নিজেকে শ্যাওলায় ঢেকে নিয়ে শান্ত হয়ে যায়। নিরু দেখতে থাকে। নিরুর গায়ে শ্যাওলা জমতে থাকে। সবুজ শাড়িতে শ্যাওলাগুলো অদৃশ্যভাবে লেগে থাকে। জড়াগ্রস্ত জীবনের থেকে এই শ্যাওলা সবুজ নিরুকে আকৃষ্ট করে বেশী।

বিজ্ঞাপন

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0181 seconds.