• ২৩ জুলাই ২০১৭ ১৫:৫৪:৩৬
  • ২৩ জুলাই ২০১৭ ১৬:৫৩:৩৮
অন্যকে জানাতে পারেন: Facebook Twitter Google+ LinkedIn Save to Facebook প্রিন্ট করুন
বিজ্ঞাপন

গ্রাম দেখা

.


ফারহানা কলি 


পদ্মার ঘোলা জলে প্রথমবার লঞ্চে চড়ে গ্রাম দেখতে যাওয়া ছিল আমার কাছে ভীষণ রোমাঞ্চকর ঘটনা। ডিসেম্বর মাস শীতের ছুটি। স্কুল বন্ধ। বসে বসে বই পড়ি।  হঠাৎ শুনলাম খালাতো ভাইয়ের নির্বাচনী প্রচারণা করতে ঢাকা থেকে সব ভা- বোন মিলে গ্রামে যাবে।

বড় ভাইয়া বলল, ‘যাবে ? গেলে তৈরি থেকো। কাল সকালে রওনা দিব ’। আমিও সুযোগের অপেক্ষায় ছিলাম কখন ভাইয়া বলবে যাবো কিনা। ব্যাস সক্কাল বেলা ব্যাগ নিয়ে তৈরি।

নারায়ণগঞ্জ থেকে লঞ্চে চড়ে পদ্মা পাড়ি দিতে গিয়ে আমার রীতিমতো কান্না পাওয়ার মতো অবস্থা । পদ্মার উথাল-পাতাল ঢেউ দেখে ভয়ে অস্থির । ভাই-বোনদের মধ্যে ছোট বিধায় সব সময়ই আদর -আবদারে থেকেছি। ভাইয়ারা সবাই এসে বলছে ভয়ের কিছু নেই। সবাইতো আছে । কিন্তু কিছুতেই মনের ভয় কাটে না। ঢেউ দেখে মনে মনে দোয়া দরুদ যা আছে সব পড়ছি।কিছুটা সন্ধ্যা হয় হয় ভাব এমন সময় চোখে পড়ল শত শত হ্যাজাক বাতি। দূর থেকে অদ্ভুত লাগে দেখতে ।হ্যাজাক বাতির আলোয় মাঝিরা নদীতে মাছ ধরে। মন্ত্রমুগ্ধের মতো মনে হয় । সেই ভর সন্ধ্যায় এই দৃশ্য আজও আমার চোখে ভাসে । আর পদ্মার ইলিশ ভাবতেই কেমন একটা অনুভূতি হয় মনে !

সন্ধ্যার সূর্য ডুবে গেলেই গ্রামের দোকান-পাট বন্ধ করে দোকানীরা বাড়ী চলে যায়। তারপরও শীতের রাত । আমরা যখন বাজারে পৌঁছেছি তখন দোকানীরা দোকান-পাট বন্ধ করার আয়োজন করছে । বাজার থেকে খালার বাড়ী দুই মিনিটের পায়ে হাঁটা পথ ।গ্রামের মেঠো পথে চাঁদের আলোয় হেঁটে চলেছি আমরা সবাই ।

চাঁদের আলোয় হেটে চলেছি আমরা ক’জন ।

মেঠো পথ আঁধো আলো আঁধো অন্ধকারে হেটে যেতে যেতে চোখে পড়ে জোনাকির আলো। সে এক অদ্ভুত জিনিস! প্রকৃতির এতো সুন্দর জিনিস চারিদিকে ছড়ানো ছিটানো! গ্রামের অন্ধকার পথ হলেও জোসনা রাত হওয়ায় আবছা আবছা সব কিছু চোখে পড়ে। পথ চলতে একটুও অসুবিধে হচ্ছিল না। পথের শেষ আর খালার বাসা শুরু। শীতের রাতে সব কিছু নির্জন হলেও এদিকটা একটু সরগরম । উঠোনে গোল করে বসে লোকজন আগুনে হাত সেঁকছে আর কথাবার্তা বলছে । আমাদের দেখে সবাই খুশিতে এগিয়ে আসল ।

রাতের খাবার সেরে শোয়ার জন্য চলে আসলাম। শোয়ার ঘরে এসে খালা মাথায় হাত রেখে বলল , ‘তোকে তোর মা আসতে দিল? আগে এতোবার বলেছি। কিন্তু কখনও রাজী হয়নি’।

ভোরবেলা মুয়াজ্জিনের আযান কানে যেতেই ঘুম ভেঙে গেল। উঠে টুথ ব্রাশ আর পেস্ট নিয়ে কলতলায় যাব। অমনি একজন এসে বলে, ‘রাখ তোমার শহুরে ভাব । কয়েক দিন আমাদের সাথে মিসওয়াক করো’ ।

বোনদের একজন হাসতে হাসতে আমাকে মিসওয়াক টা বাড়িয়ে দিল । আমি আগেও মিস্ওয়াক করেছি । দাদী বলতেন মিস্ওয়াক করা সুন্নাহ । টিউবওয়েল চেপে পানি তুলে চোখে মুখে পানি দিতেই মনে হলো সব ঠান্ডায় জমে যাচ্ছে । দৌঁড়ে এসে খালা গরম পানি মিশিয়ে নাতিশীতোষ্ণ  করে দিল । নাস্তা খেলাম দুধ চিতই পিঠা । রসে ভেজানোর পিঠা আর গরম গরম চিতই পিঠা খোলায় দেয়া হচ্ছে। সকাল বেলা মনে হলো গরম চিতই ভাল হবে ।

এযাবতকাল শুধু পড়েছি গ্রামের শীত হাড় কাঁপানো । হাওয়া বইতেই এখন দেখছি সত্যিই তাই । কনকনে ঠান্ডায় সবাই জুবুথুবু ।

বাড়ির বারান্দায় বসে স্কুল ঘর চোখে পড়ে । শীতের ছুটি স্কুল বন্ধ ।নির্বাচন নিয়ে ভাইয়ারা সবাই ব্যস্ত হয়ে গেল।

হঠাৎ দেখি ভাইয়ারা সবাই এসে হাজির । বলল চল চল.. মজার জিনিস দেখাব । শীত বলে নয় , আমি সব সময়ই তৈরি থাকি । বের হয়ে প্রায় পনের ষোলজন হবে সবাই হাটতে থাকলাম স্কুলের দিকে। স্কুলের সামনে বিশাল মাঠ। তার ঐ পারে কেউ একজন গাছ থেকে খেজুরের রস পাড়ছে । গাছ থেকে পাড়া সেই খেজুরের রস মাটির কলসে করে নিয়ে এলো আমাদের জন্য।এক একজন পান করছে। মনে হচ্ছে যেন অমৃত খাচ্ছি।আহ! এখনও মুখে লেগে আছে সেই স্বাদ ! শুনেছি বেশিক্ষন  রাখলে সেটা তাড়ি হয়ে যায় । যা খেলে নাকি নেশা হয় ।সত্যিই হয় কিনা জানা নেই। আর হলেই বা ক্ষতি কি !

কুয়াশা ঘেরা সকালে খেজুরের রস খেয়েই মনে হলো একটু চা হলে মন্দ হতো না । এরই মধ্যে ঠিক হলো সারা দিনের কর্মসূচি । আমার  মাথা মোটেও সেদিকে কাজ করছিল না । ভাবছি কিভাবে সারাটা গ্রাম ঘুরে দেখা যায় ।শীতের প্রকোপও মনে হলো এখানে একটু বেশি । কাঠ আর খড়  দিয়ে আগুন জ্বেলে দিয়েছে মাঠের কোনায় যে দিকটায় আমরা বসে আছি ।হাল্কা ওম ওম ভাব। ভালই লাগছিল । চায়ের ডাক পড়তেই সবাই বলল না, খাবে না। প্রস্তাব করল বাজারে যেয়ে স্বর পড়া দুধের চা খাওয়ার । কথার মাঝেই লক্ষ্য করলাম গ্রামের লোকজন এসে একে একে ভিড় করছে আগুনের চারিদিকে । সবাই আত্মীয় স্বজন । সবাই নির্বাচনী প্রচারণায় ব্যাস্ত।

স্কুলের মাঠ পেরিয়ে কিছুটা পথ গেলেই চারিদিকে ফসলের মাঠ । বাংলার অপরূপ দৃশ্য । চোখ জুড়িয়ে যায় সেই সবুজের মায়ায়।

হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ হারিয়ে গেলাম সেই অবারিত সবুজের মাঠে। সর্ষে ক্ষেতের মাঠ চারিদিকে চোখ ধাঁধানো সবুজের মাঝে হলুদের সমারোহ । আমি অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলাম । জীবনে প্রথম দেখা সেই সবুজের মাঝে হলুদের সমারোহ চোখের কোনে ছাপ রেখে দিল সারা জীবনের জন্য ।

বাজারে পৌঁছেই চায়ের জন্য বসে গেলাম । লাইন ধরে কাঠের বেঞ্চিতে । খাঁটি দুধের স্বর পড়া চা আর লাঠি বিস্কুট । শীতের দিনে ভোরের কুয়াশা ঠেলে সূর্য কিরণে হালকা ওম অনুভব করছিলাম । তার একটু পরেই স্বর পড়া গরম চা আর লাঠি বিস্কুটের স্বাদ জিভে লেগে গেল অনন্তকালের মতো । ইস! সেই স্বাদ পৃথিবীর কোথায়ও পেলাম না আজও ।

এখান থেকেই সবাই যার যার মতো নির্বাচনী কাজে চলে গেল । বাকী রয়ে গেলাম আমি,আমার ভাগ্নি আর এক ছোট ভাই । এই সুযোগে বললাম চল গ্রামটা ঘুরে আসি ।

রোদের তেজ বাড়ার সাথে সাথে শীতের প্রকোপ ও কমে গেল । তিনজন মিলে শুরু হলো গ্রাম পরিদর্শন । গ্রামের প্রতিটি মানুষ মনে হলো খুব সহজ সরল আন্তরিক । যে বাড়ীর সামনে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি সে বাড়ীর লোকজন বের হয়ে এসে জিজ্ঞেস করছে কে?কেমন আছি ? অনুরোধ করছে যেন বসে কিছু মুখে দিয়ে যায় ।সত্যি সত্যি এক বাড়ীতে বসে গেলাম নারকেলের নাড়ু, মুড়ি, গুড় হাতে নিয়ে। আহ্! কী যে মজা!

গ্রামের শেষটায় মসজিদ। তার পাশে শান বাঁধানো পুকুর ঘাট। উপর থেকে চালতা গাছে বড় বড় চালতা ধরে আছে ।জীবনে শুক্কুর আলীর কাছে এতো  চালতা খেয়েছি । কিন্তু এই প্রথম গাছে দেখলাম ।শুক্কুর আলীর গল্প আরেক দিন বলব। এই মানুষটার কাছে আমি সারা জীবন ঋণী ।

শান বাঁধানো পুকুর ঘাট । পানিতে পা ভিজিয়ে বসে বসে দেখছিলাম পুকুরে ফুটে ওঠা লাল সাদা শাপলা গুলো। খুব মন কাড়া। নির্বাচনের আগেই আমি চলে এসেছিলাম ভাইয়ার সাথে । তবে এই দু'দিনে নিয়ে এসেছি জীবনের অনেক অনেক মধুর স্মৃতি আর ভাল লাগা সময়গুলো ।

এভাবে আর কোন দিন আমার গ্রামে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। কারণ আমাদের কোন গ্রামের বাড়ি নেই যে!

বিজ্ঞাপন

সংশ্লিষ্ট বিষয়

ফারহানা কলি

আপনার মন্তব্য

বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
Page rendered in: 0.0191 seconds.