ফিচার ডেস্ক

অন্যকে জানাতে পারেন:

mahishmati
বাহুবলীর মহিষমতি।

সিনেদুনিয়ায় এখন একটাই নাম 'বাহুবলী, দ্য কনক্লুশান'। দর্শকদের প্রত্যাশাকে রীতিমতো ছাপিয়ে গিয়েছে রাজামৌলির 'বাহুবলী'। চোখ ধাঁধানো সেট, গ্রাফিক্স, অভিনয় সব দিক থেকেই উত্তীর্ণ 'বাহুবলী'। হাজার পেরিয়ে এখন পনেরশ কোটির দিকে রমরমিয়ে চলছে সিনেমাটি।

যে বা যারা এখনও বাহুবলীর কোনও অংশই দেখেননি, তারাও 'মহিষমতী' নামটার সঙ্গে পরিচিত। এস এস রাজামৌলির এই ছবির গোটা গল্প জুড়েই রয়েছে মহিষমতি রাজ্য। তবে আপনি কি জানেন এই মহিষমতী সাম্রাজ্য কোনও কাল্পনিক স্থান নয়?

বাস্তবেই অস্তিত্ব রয়েছে এই স্থানের। গুগলে গিয়ে মহিষমতি লিখলেই জানতে পেরে যাবেন এর। উইকিপিডিয়াতে বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে এই সাম্রাজ্যের।

মধ্যপ্রদেশের নর্মদা নদীর ধারেই রয়েছে মহিষমতী। বিভিন্ন প্রাচীন পুঁথিতেই এই সাম্রাজ্যের বর্ণনা পাওয়া যায়। ইতিহাস অনুযায়ী, অবন্তী সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল মহিষমতি। পরবর্তীকালে অনুপা সাম্রাজ্যের রাজধানী রূপে পরিচিতি পায় মহিষমতি। অবন্তী সাম্রাজ্যের দুটি শক্তিকেন্দ্র ছিল। উত্তরে উজ্জয়িনী এবং দক্ষিণে মহিষমতি।

অবন্তী ও মহিষমতি

অবন্তী প্রাচীন মধ্য ভারতের একটি রাজ্য ছিল। বৌদ্ধ গ্রন্থ সুত্তপিটকের অঙ্গুত্তরনিকায় অংশে অবন্তীকে ষোড়শ মহাজনপদের অন্যতম বলে বর্ণনা করা হয়েছে। বিন্ধ্য পর্বতমালা দ্বারা এই জনপদ দুইভাগে বিভক্ত ছিল, উত্তর ভাগের রাজধানী ছিল উজ্জয়িনী এবং দক্ষিণ ভাগের রাজধানী ছিল মহিষমতি।

মহাভারতের উদ্যোগ পর্বে অবন্তীর অধিবাসীদের মহাবল হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বিষ্ণু পুরাণ, ভগবৎ পুরাণ ও ব্রহ্ম পুরাণ অনুসারে, তাঁদের বিন্ধ্য পর্বতমালার পশ্চিম শাখা পারিযাত্রা পর্বতের অধিবাসী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

পুরাণ অনুসারে, হৈহেয় গণসমষ্টি অবন্তীর প্রাচীন শাসক ছিলেন, যাঁরা মহিষমতিকে রাজধানী করে রাজ্যশাসন করতেন। বীতিহোত্র, ভোজ, অবন্তী, তুন্ডীকের ও সর্য্যত এই পাঁচটি গোষ্ঠী নিয়ে হৈহেয় গণসমষ্টি গঠিত ছিল। পরবর্তীকালে বীতিহোত্র গণ শক্তিশালী হলে হৈহেয় ও বীতিহোত্র উভয়ে একই গণ হিসেবে উল্লিখিত হতে থাকে। দীঘনিকায়ের মহাগোবিন্দসুত্তে অবন্তীরাজ বিশ্বভূর উল্লেখ রয়েছে, যিনি মহিষমতি থেকে রাজ্যশাসন করতেন। শেষ বীতিহোত্র শাসক রিপুঞ্জয়কে তাঁর অমাত্য পুলিকা সিংহাসনচ্যুত করেন এবং নিজপুত্র পজ্জোতকে সিংহাসনে আসীন করেন।

গৌতম বুদ্ধের সমসাময়িক পজ্জোত বা প্রদ্যোত, যিনি চণ্ডপ্রদ্যোত মহাসেন নামেও পরিচিত ছিলেন, অবন্তীর প্রদ্যোত রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তিনি বৎসরাজ উদয়নকে পরাজিত করেন, কিন্তু পরে উদয়ন প্রদ্যোতের কন্যা বাসবদত্তাকে বিবাহ করেন। মগধের হর্য্যঙ্ক রাজবংশীয় রাজা অজাতশত্রু প্রদ্যোতের আক্রমণ থেকে তাঁর রাজধানী রাজগৃহকে রক্ষা করার জন্য প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলেন। তিনি তক্ষশিলার রাজা পুষ্করসারিনের সঙ্গেও যুদ্ধে লিপ্ত হন।

প্রদ্যোতের পর তাঁর পুত্র পালক অবন্তীর সিংহাসনে আরোহণ করেন। কথাসরিৎসাগর অনুসারে, পালকের রাজত্বকালে বৎস রাজ্য অবন্তীর অন্তর্ভুক্ত হয় এবং প্রদ্যোত রাজবংশের রাজপুরুষেরা কৌশাম্বী নগরীতে অবন্তীর রাজপ্রতিনিধি হিসেবে শাসনকার্য্য পরিচালনা করতেন। মৃচ্ছকটিক গ্রন্থে পালককে একজন স্বৈরাচারী শাসক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যাকে জনগণের বিদ্রোহের ফলে সিংহাসনচ্যুত হতে হয়। এই বিদ্রোহের ফলে আর্য্যককে অবন্তীর সিংহাসনে বসানো হয়। পুরাণে আর্য্যকের পরে পরবর্তী শাসক হিসেবে বর্তিবর্ধন বা নন্দীবর্ধনের উল্লেখ রয়েছে, কিন্তু এই নামগুলি সম্ভবতঃ অবন্তীবর্ধনের ভিন্ন নাম; কথাসরিৎসাগর অনুসারে, যিনি পালকের পুত্র বা নেপালী বৃহৎকথা অনুসারে, পালকের ভ্রাতা গোপালের পুত্র হিসেবে যিনি পরিচিত। মগধের রাজা শিশুনাগ অবন্তীবর্ধনকে পরাজিত করে অবন্তী রাজ্যকে মগধের অন্তর্ভুক্ত করেন।

শিশুনাগ রাজবংশের শাসনে অবন্তী মগধের অন্তর্ভুক্ত হয়। মৌর্য্য সাম্রাজ্যের অধীনে অবন্তী সাম্রাজ্যের পশ্চিমদিকের একটি প্রদেশে পরিণত হয়, যখন তাঁর নতুন নাম হয় অবন্তীরট্ঠ  এবং উজ্জয়িনী নগরী এই প্রদেশের রাজধানী ছিল।  প্রথম রুদ্রদমনের জুনাগড় শিলালিপিতে চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য্যের রাজত্বকালে এই প্রদেশের শাসনকর্তা ছিলেন পুষ্যগুপ্ত। বিন্দুসারের রাজত্বকালে অশোক এই প্রদেশের শাসনকর্তা ছিলেন। মৌর্য্য সাম্রাজ্যের পতনের পর পুষ্যমিত্র শুঙ্গের রাজত্বকালে তাঁর পুত্র অগ্নিমিত্র এই প্রদেশ শাসন করেন।

হরিবংশের ইতিহাসে অনুযায়ী, রাজা মাহিশমতের হাত ধরে এই সাম্রাজ্য প্রথম তৈরি হয়। তবে এই নিয়ে বেশ কিছু জল্পনা রয়েছে। অনেকের মতে, এই সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মুচুকুন্দা।

মহিষমতী বর্তমানে মহেশ্বরা নামে পরিচিত এবং মাহেশ্বরী শাড়ির জন্য বিখ্যাত এই এলাকা। তবে বাস্তবের মহিষমতির কোনো কাহিনী বাহুবলীতে নেই।

আপনার মন্তব্য