নিজস্ব প্রতিবেদক

অন্যকে জানাতে পারেন:

দেশের প্রধান দুই খাদ্যশস্য চাল ও গমের উৎপাদন গত অর্থবছর কিছুটা ব্যাহত হয়েছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছর এ দুই খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমেছে ৩ শতাংশ। এর বিপরীতে চলতি অর্থবছরের প্রথম সাত মাসেই চাল ও গমের আমদানি বেড়েছে প্রায় ৯০ শতাংশ।

উৎপাদন ঘাটতির মধ্যেই এ সময় রোহিঙ্গাদের বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি বর্ধিত জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে কিছুটা বাড়তি খাদ্যশস্যের প্রয়োজন। তবে আমদানি যে পরিমাণে বেড়েছে, তাকে অস্বাভাবিক বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, হয় উৎপাদনের তথ্যে গরমিল আছে, তা নাহলে আমদানির আড়ালে অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটছে।

গত বছর হাওড়ের বন্যায় বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতির কারণে চাল উৎপাদনে টান পড়ে। ব্লাস্টের কারণে কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন হয়নি গমেরও। ফলে এ দুই খাদ্যশস্যের উৎপাদনে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছর দেশে চাল ও গম উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩ কোটি ৫১ লাখ টন। আগের অর্থবছর এর পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ৬০ লাখ ৫৭ হাজার টন। অর্থাৎ গত অর্থবছর প্রধান দুই খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমেছে সাড়ে নয় লাখ টন।

খাদ্যশস্যের এ উৎপাদন ঘাটতির মধ্যেই নতুন করে যুক্ত হয়েছে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গার চাপ। তাদের পাশাপাশি দেশের বর্ধিত জনগোষ্ঠীর খাদ্যচাহিদা পূরণে খাদ্যশস্যের আমদানি কিছুটা বাড়ার কথা থাকলেও বেড়েছে অস্বাভাবিক হারে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের জুলাই-জানুয়ারি সময়ে দেশে চাল ও গম আমদানি হয়েছে ৬৮ লাখ ৪০ হাজার টন। অথচ গত অর্থবছরের একই সময়ে পণ্য দুটির আমদানি ছিল ৩৬ লাখ ৩৭ হাজার টন। অর্থাৎ সাড়ে নয় লাখ টন উৎপাদন ঘাটতির বিপরীতে অর্থবছরের প্রথম সাত মাসেই আমদানি বেড়েছে প্রায় ৩২ লাখ টন।

উৎপাদন ঘাটতি ও চাহিদার সঙ্গে আমদানির এ তথ্য সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে মনে করেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক ড. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, উৎপাদন ঘাটতির সঙ্গে বাড়তি মানুষের প্রয়োজন যোগ করলে যে চাহিদা দাঁড়ায়, সাত মাসে তার চেয়ে বেশিই আমদানি হয়েছে। তাহলে হয় আমদানির তথ্যে, না হয় উৎপাদনের তথ্যে গরমিল আছে। আবার প্রয়োজনের তুলনায় বাড়তি আমদানি হলে দেশে চালের বাজারে দাম কমার কথা। কিন্তু গত কয়েক মাসে সেটিও সেভাবে দেখা যায়নি। ফলে চাল আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণা দেয়া হচ্ছে কিনা, তা দেখতে হবে। পাশাপাশি উৎপাদনের তথ্যেও সঠিকতা আনতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রাপ্ত আমদানি ব্যয়ের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে শুধু চাল আমদানিতে ব্যয় হয়েছে ৭ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা। যদিও গত অর্থবছরের একই সময়ে পণ্যটি আমদানিতে ব্যয় হয়েছিল মাত্র ৮৮ কোটি টাকা। আরেক প্রধান খাদ্যশস্য গম আমদানিতে ২০১৭-১৮ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ব্যয় হয়েছে ৫ হাজার ৭১৭ কোটি টাকা। গত অর্থবছরের একই সময়ে খাদ্যশস্যটি আমদানি হয়েছিল ৪ হাজার ১৮৩ কোটি টাকার।

খাদ্যশস্য আমদানির এ পরিসংখ্যানে সন্দেহ জাগছে ব্যাংকারদের মধ্যেও। ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান ও মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনিস এ খান এ প্রসঙ্গে বলেন, গত কয়েক মাসে বিপুল পরিমাণ চালসহ খাদ্যশস্য আমদানি হয়েছে। তারপরও চালের বাজারে পুরোপুরি স্থিতিশীলতা আসেনি। যে পরিমাণ খাদ্যশস্য আমদানি হয়েছে, সে পরিমাণ চাহিদা না থাকলে এ বিপুল পরিমাণ খাদ্যশস্য যাচ্ছে কোথায় সেটি দেখতে হবে।

গত অর্থবছর চালের উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানির মাধ্যমে ঘাটতি পূরণে জোর দেয়া হয়। চাল আমদানিতে আরোপিত ২৮ শতাংশ শুল্ক ২ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়। পাশাপাশি শূন্য মার্জিনে চাল আমদানিরও সুযোগ দেয়া হয় ব্যবসায়ীদের। এসবের ফলে পণ্যটির আমদানি অস্বাভাবিক বেড়ে যায়।

খাদ্যশস্য আমদানির আড়ালে অর্থ পাচারের মতো ঘটনা ঘটছে কিনা, জানতে চাইলে সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ওবায়েদ উল্লাহ্ আল মাসুদ বলেন, চাল আমদানিতে ঋণপত্র খোলা হলে তার দাম আন্তর্জাতিক তথ্যের সঙ্গে যাচাই করে দেখা হয়। এছাড়া পণ্য না দিয়ে জাহাজ ডুবিয়ে দিতে পারে, এমন শঙ্কার কথা বিবেচনায় নিয়ে চার্টার্ড ভেসেল পরিহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি জাহাজগুলো পরীক্ষা করা হয়। ফলে মেশিনারি আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণার যে গুঞ্জন আছে, খাদ্যশস্য আমদানিতে তা বিন্দুমাত্রও নেই।

তবে আমদানির পরিমাণটা অস্বাভাবিক মনে করছেন খাদ্য মন্ত্রণালয়ের সাবেক সচিব আবদুল লতিফ মন্ডল। তিনি বলেন, আমদানির তথ্য যদিও সঠিকও হয়, সেক্ষেত্রে দেশে খাদ্যশস্যের বাড়তি মজুদ তৈরি হবে। ফলে সামনের বোরো মৌসুমে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য নাও পেতে পারেন। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন স্বপ্নই থেকে যেতে পারে।

আপনার মন্তব্য

Daraz Bangla New Year
advertisement

advertisement
advertisement