অন্যকে জানাতে পারেন:


মওদুদ রহমান


খুব শীঘ্রই হয়তো আবার বাড়তে যাচ্ছে বিদ্যুতের দাম। যদি তাই হয় তবে এটি হবে গত সাত বছরের মধ্যে সপ্তমবারের মত দাম বাড়ানোর ঘোষণা। চাল আর পেঁয়াজের রেকর্ড মূল্যবৃদ্ধিতে দিশেহারা মানুষের উপর এই ঘোষণা নিশ্চিতভাবেই ‘মরার উপর খাড়ার ঘা’ হতে চলেছে। আমাদের নীতি নির্ধারকেরা এইভাবে দাম বৃদ্ধির ঘটনাকে এখন আর ‘দাম বৃদ্ধি’ বলেন না, উনাদের ভাষায় এটা ‘মূল্য সমন্বয়!’ তবে নাম যাই হোক না কেনো, জীবনযাত্রায় এই চাপের বোঝা হবে অবর্ণনীয় যন্ত্রণার। বাংলাদেশের মানুষ যখন বিদ্যুৎ ব্যবহার করতে যেয়ে লুটের মচ্ছবের আগুনে পুড়ছে ঠিক তখনই পাশের দেশ ভারতে রেকর্ড ভাঙ্গা কম মূল্যে সৌর আর বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে। সেখানে এই দুই উৎস হতে উৎপাদিত বিদ্যুতের দাম ইউনিট প্রতি এখন সাড়ে তিন টাকারও নীচে নেমে গেছে। ভারত সরকার ২০২২ সালের মধ্যেই ১ লক্ষ মেগাওয়াট সোলার এবং ৬০ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার বায়ু বিদ্যুৎ উৎপাদনী ক্ষমতা গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

বর্তমান সরকার প্রথম মেয়াদে ক্ষমতায় এসেই বিদ্যুৎ খাতে ‘জরুরী অবস্থা’ মোকাবেলা করার নাম করে ফার্নেস এবং ডিজেলভিত্তিক ‘রেন্টাল’ আর ‘কুইক রেন্টাল’ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সূচনা করে। কিন্তু তারা দ্বিতীয় মেয়াদের প্রান্তে এসে পড়লেও বিদ্যুৎ খাতের সেই জারি করা ‘জরুরী অবস্থা’ এখনও চলছে! এরই মধ্যে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে লাগামহীনভাবে। সাময়িক খরুচে বিদ্যুত উৎপাদনী ব্যবস্থা পেয়েছে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। আর এ সকল অনিয়ম, অব্যবস্থাপনাকে চ্যালেঞ্জ করা যে কোন উদ্যোগের বিপরীতে সুরক্ষার চাদর হিসেবে উনারা পাশ করে নিয়েছেন বিশেষ আইন। বিদ্যুৎ খাতের এই ‘উন্নয়ন’ নিয়ে এখন ধরা যাবে না, ছোঁয়া যাবে না, বলা যাবে না কোন কথা! অবশ্য উন্নয়নের নাম নিয়ে করা এই বিষ ফোঁড়াগুলো সাধারণের জন্য যন্ত্রণাদায়ক হলেও ব্যবসায়ীদের জন্য এসেছে সোনায় সোহাগা হয়ে। কম সময়ে বেশী লাভ তুলে আনা এই খাত এতটাই উর্বর হয়ে উঠেছে যে দেশের জনপ্রিয় ফার্নিচার কোম্পানী ‘অটবি’ পর্যন্ত এক পর্যায়ে বিদ্যুৎ বিক্রি করা শুরু করে দিয়েছিল (দ্য ডেইলী স্টার, ১ জুলাই, ২০১৬)।

উচ্চমূল্যের তরল জ্বালানীভিত্তিক বিদ্যুৎই বাংলাদেশে প্রাধান্য পাচ্ছে। বর্তমানে এটির উৎপাদন সক্ষমতা ৩০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে যা কিনা ২০০৮-০৯ সালেও ছিল ৮.৬ শতাংশ। এই জ্বালানীভিত্তিক বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট মূল্য উঠে যাচ্ছে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত। অথচ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র হতে বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে তিন টাকারও কম মূল্যে। গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কম উৎপাদনের যুক্তি হিসেবে সরকারের পক্ষ থেকে গ্যাসের অপ্রতুলতাকেই দায়ী করা হয় কিন্তু ঘটনার প্রকৃত কার্যকারণ অনুসন্ধানে সর্বজনের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে ব্যবসায়িক স্বার্থ রক্ষার কারণেই এমনটা হচ্ছে বলে নিশ্চিত হওয়া যায়। আর তাইতো এ বছরের অক্টোবরের শেষ সপ্তাহ থেকে গ্যাসের চাপ না থাকার কথা বলে চট্টগ্রামের চারটি রাষ্ট্রীয় গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাসের সাপ্লাই বন্ধ করে দিলেও সেখানকার সাতটি বেসরকারী বিদ্যুৎ কেন্দ্রে গ্যাসের সাপ্লাইয়ে কোন কমতি হয়নি। ২০০১ সালেই এক যৌথ জরিপ রিপোর্ট থেকে জানা যায় যে, বাংলাদেশে আরও কমপক্ষে ৩২ টিসিএফ গ্যাস পাবার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু সেই সম্ভাবনার কথা আজও কাগজ-কলমেই রয়ে গেছে, বাস্তব কোন ফল পাওয়া যায় নি। এরই মাঝে বিদেশী কোম্পানীর সাথে অসম চুক্তি হয়েছে। বিভিন্ন কোম্পানী প্রকল্প কাজের দায়িত্ব পেয়েছে, জনগণের কোটি কোটি টাকা খরচের খাতায় উঠেছে কিন্তু প্রাপ্তির অংক শুন্য। গ্যাস উত্তোলন আর অনুসন্ধানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাপেক্স একটি পরীক্ষিত নাম। এটির দক্ষতা আর কম খরচে কাজ শেষ করার সুনাম দীর্ঘদিনের। কিন্তু প্রকল্প বরাদ্দের পুরষ্কার কোন জবাবদিহিতা ছাড়াই জোটে বিদেশী কোম্পানীর ভাগ্যে। যদি বাপেক্সের সত্যিকার অথেই কোন দুর্বলতা আছে বলে সরকার মনে করে, তবে পূর্ণ সহায়তা দিয়ে এই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে জাতীয় সম্পদ আহরণে যোগ্য করে গড়ে তোলা তো সরকারেরই দায়িত্ব। কিন্তু উন্নয়নের ভূত এই বেলাতেও উলটো পথেই হাঁটছে।

রাষ্ট্রের আওতাধীন বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অনিয়মিতভাবে চালানোতেই যেন নীতি-নির্ধারকদের আনন্দ! সময়ে-অসময়ে নানা কায়দায় কম মূল্যের বিদ্যুৎ উৎপাদনী কেন্দ্রগুলো বন্ধ করে বেসরকারী বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সুযোগ দেয়ার ফলেই বিদ্যুতের দাম বেড়ে আজকের অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। উদারহণস্বরূপ, ২০১৫ সালের কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। ঐ বছরে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ৪৫.৮ টেরাওয়াট-আওয়ার। যদি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে গড়পড়তা মানেও চালানো যেতো তবে ঐ সময়ের পুরো বিদ্যুৎ চাহিদা সিস্টেমে উপস্থিত গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো হতেই পাওয়া যেতো। কিন্তু সেটা হলে তো আবার বিদ্যুৎ খাতে লুটতরাজটা ঠিক ভাবে চালানো যায় না! তাই অদক্ষতা-অব্যবস্থাপনা আর অদূরদর্শীতার জালে আটকা পরে ঐ বছর ০.৫ টিসিএফ গ্যাস পুড়িয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয় মাত্র ৩১.৮ টেরাওয়াট-আওয়ার।  

বাংলাদেশে কয়লা বিদ্যুতের ব্যবহার এখনও পর্যন্ত সীমিত হলেও এর ভবিষ্যৎ লক্ষ্যমাত্রা ভয়ংকর। দেশে দেশে যখন কয়লা ব্যবহার বন্ধ করার ঘোষণা দেয়ার প্রতিযোগীতা চলছে ঠিক সেই সময়ে বাংলাদেশ এই কয়লা বিদ্যুতের ব্যবহার যেনতেনো উপায়ে বাড়াতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। বিদ্যুৎ খাতের মহাপরিকল্পনা (পিএসএমপি-২০১৬) অনুসারে ২০৪১ সালের মধ্যে এই বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা হবে ১৯ হাজার মেগাওয়াট যা বর্তমানে ৫০০ মেগাওয়াট মাত্র। অথচ ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জার্মানী ইতোমধ্যেই এই কয়লা বিদ্যুতকে বিদায় জানাতে যথাক্রমে ২০২৩, ২০২৫, ২০৩০ এবং ২০৫০ সালের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে। চীন কেবল এ বছরেই নির্মাণের বিভিন্ন পর্যায়ে থাকা ১ লক্ষ ২০ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার ১০৪টি কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাতিল বলে ঘোষণা দিয়েছে। সেখানে বায়ু দূষণ থেকে পরিত্রাণ পেতে ৫ বছরের জন্য ২৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছে যা কিনা বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে পরিচিত এই দেশের প্রতিরক্ষা বাজেটের দ্বিগুনেরও বেশী। পাশাপাশি বিদ্যুৎ চাহিদা মেটাতে নবায়নযোগ্য জ্বালানী খাত উন্নয়নে চীন ২০২০ সালের মধ্যে ৩৬১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দিয়েছে যা কেবল বিদ্যুতের জোগানই যে দিবে তা নয়, সেই সাথে ১ কোটি ৩০ লক্ষ নতুন কর্মসংস্থানও সৃষ্টি করবে।    

ভারতে ইতোমধ্যেই গড়ে তোলা হাজার হাজার কোটি টাকা মূল্যমানের কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্পদ অনুৎপাদনশীল হয়ে পড়ে আছে শুধুমাত্র চাহিদা না থাকার কারণে। এই বছরেই টাটা পাওয়ার মুন্দ্রার ৪ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ৫১ শতাংশ শেয়ার দায়-দেনা সহ মাত্র ১ রূপী প্রতিকী মূল্যে বিক্রি করে দেয়ার প্রস্তাব জমা দিয়েছে। কেন্দ্রটি চালু হবার পাঁচ বছরের মধ্যেই কোম্পানীর ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু আমাদের নীতি-নির্ধারণী মহল যেনো ‘কানে তুলো আর পিঠে কুলো’ ঝুলিয়ে বসে আছেন। আশেপাশের কোন কিছু থেকে শেখায় উনাদের কোন মন নেই। তাইতো সুন্দরবনের পাশে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ কাজ চালিয়ে নিতেও উনাদের বাঁধছে না। এই কেন্দ্রটির নির্মাণ কাজের দায়িত্বে আবার আছে অদক্ষতার দায়ে কুখ্যাত ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান এনটিপিসি। এই বছরের নভেম্বর মাসের ১ তারিখেই এনটিপিসি নির্মিত সদ্য উদ্বোধন হওয়া রাই বেরালি ৫০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রে বিস্ফোরণ হয়। এতে করে এখন পর্যন্ত মারা গেছে ৩৭ জন আর আহত হয়েছে শতাধিক। কিন্তু মিষ্টি প্রলেপ দিয়ে তেতো ওষুধ গেলানোর মত করে “উন্নত প্রযুক্তি”, “পরিবেশ বান্ধব” ইত্যাদি নানা শব্দ আরোপ করে রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্রের কাজ এখনও চলছে।   

পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলার বিশাল লক্ষ্যমাত্রাও বর্তমান বিশ্বের সাথে সামঞ্জস্যহীন। পিএসএমপি-২০১৬ অনুসারে ২০৪১ সালের মধ্যেই বাংলাদেশের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সক্ষমতা হবে ৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াট যা বর্তমানে শূন্য। অথচ অর্থনীতির উপর ভয়াবহ চাপ আর মারাত্নক দূর্ঘটনার শঙ্কায় উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারে পারদর্শী অনেক দেশই এ বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে। ইন্সুরেন্স খরচ, উচ্চমান নিশ্চিত করণে নিয়ত প্রযুক্তি উন্নয়ন খরচ, বন্ধ হয়ে যাওয়া পারমাণবিক কেন্দ্রকে তেজস্ক্রিয় নিঃসরণ ঝুঁকি নিবারণমূলক খরচ, এসব কিছু বিবেচনায় নিলে পরমাণু বিদ্যুৎ অন্য যে কোন বিদ্যুতের চেয়ে বেশী খরুচে। তাইতো আমরা দেখি যে, ২০০৭ সালে নির্মাণ কাজ শুরু হওয়া ফ্রান্সের ফ্লেমেনভিলেতে ১৫৭০ মেগাওয়াট ক্ষমতার পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ ২০১২ সালের মধ্যে শেষ করার প্রাথমিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। প্রারম্ভিক ব্যায় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩.৩ বিলিয়ন ইউরো। নানা ধাপে খরচ বাড়িয়ে এখন বলা হচ্ছে এটি নির্মাণে ১০.৫ বিলিয়ন খরচ হবে আর নির্মাণ কাজ শেষ হবে ২০১৮ সালে। এমনিভাবে প্রকল্প কাজ শুরু হয়ে যাবার পর নানা কারণ আর অযুহাতে নির্মাণ খরচ কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়া এক্ষেত্রে একটি সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে। খরচ ছাড়াও দূর্ঘটনার শঙ্কা যে প্রযুক্তি দিয়ে ঠেকিয়ে রাখা যায় না তা থ্রি মাইল আইল্যান্ড, চেরনোবিল আর ফুকুশিমা দূর্ঘটনার মাধ্যমে এরই মাঝে প্রমাণ হয়ে গেছে। হয়তো এ কারণেই এ সিদ্ধান্ত গ্রহণে নিজেদের সকল দায়দায়িত্ব এড়াতে সরকার দায়মুক্তি আইন পাশ করে নিয়েছে।  
পুরো পৃথিবীজুড়েই নবায়নযোগ্য জ্বালানী বর্তমানে সস্তা, নির্ভরযোগ্য এবং দূষণ্মুক্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাধ্যম হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। ২০৫০ সালের মধ্যে জার্মানী কমপক্ষে ৮০ ভাগ এবং ২০২০ সালের মধ্যে ডেনমার্ক মোট বিদ্যুৎ চাহিদার কমপক্ষে ৫০ ভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানী হতে উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। ভারত অজীবাশ্ন জ্বালানী খাত ভিত্তিক উৎপাদন ক্ষমতা ২০২৭ সালের মধ্যেই ৫৭ শতাংশে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশের জ্বালানী নীতিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানী আর আমদানী করা বিদ্যুৎকে একে অপরের পরিপূরক হিসেবে দেখানো হয়েছে। পিএসএমপি-২০১৬’তে বলা হয়েছে, ২০৪১ সালের মধ্যে মাত্র ১৫ শতাংশ বিদ্যুৎ আসবে নবায়নযোগ্য জ্বালানী কিংবা আমদানী করা বিদ্যুতের মাধ্যমে। একই নীতিমালায় নবায়নযোগ্য জ্বালানী ভিত্তিক উৎপাদন সাম্ভাব্যতা দেখানো হয়েছে মাত্র ৭ টেরাওয়াট-আওয়ার যা ২০৪১ সালের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার মাত্র ৩ শতাংশ! পিএসএমপি-২০১৬’তে মোট নবায়যোগ্য জ্বালানী ভিত্তিক উৎপাদন ক্ষমতা বলা হয়েছে মাত্র ৩ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত এক গবেষণা হতে জানা যায় যে কেবল বায়ু বিদ্যুতেই বাংলাদেশের সম্ভাবনা রয়েছে ২০ হাজার মেগাওয়াটের ( Saifullah et al, 2016)। বিশ্বজুড়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানী ভিত্তিক বিদ্যুতের দাম পড়ে যাবার বিষয়টি পিএসএমপি-২০১৬’তে উল্লেখ করা থাকলেও আশ্চর্যজনকভাবে এই সস্তা বিদ্যুৎ খাত উন্নয়নে সদ্য প্রকাশিত এই নীতিমালায় কোন আগ্রহ দেখা যায়নি।

নবায়নযোগ্য জ্বালানী ভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রারম্ভিক খরচ এখন আর কোন বাঁধা নয়। নিয়ত কমতে থাকা খরচের কারণে এই খাতে বিনিয়োগ অন্য যে কোন খাতের চেয়ে লাভজনক। জমি কেন্দ্রিক বিতর্কের সমাধান হিসেবে আসছে নিত্য নতুন উদ্ভাবন। ভাসমান সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র, ফসলি জমিতে ফসলের পাশাপাশি সোলার, মিনি গ্রীড, মাইক্রো গ্রীড ইত্যাদি নানা উপায়ে এখন বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাচ্ছে। কয়লা কিংবা নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্র বাসাবাড়ির ছাদে, পুকুর কিংবা নদীর পাড়ে, পরিত্যক্ত জমিতে, রাস্তার দু পাশে গড়ে তোলা সম্ভব নয় কিন্তু সৌর বিদ্যুৎ এসব স্থানের জন্য খুবই উপযুক্ত। প্রচলিত জ্বালানী কেন্দ্রিক বিদ্যুৎ যেখানে লাগামহীন ব্যবহারকে উৎসাহ দিচ্ছে, নবায়নযোগ্য জ্বালানী ভিত্তিক বিদ্যুৎ সেখানে নিত্যনতুন উদ্ভাবন আর সুরক্ষার নিশ্চয়তা দিচ্ছে। 

জাতীয়, আন্তর্জাতিক  দু পর্যায়েই নবায়নযোগ্য জ্বালানী খাত উন্নয়নে গবেষণামূলক কাজ হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষক দল দীর্ঘ সময় ধরে জ্বালানী সংকট মোকাবেলায় দেশভিত্তিক সর্বোত্তম জ্বালানী সংমিশ্রণ বের করার মডেল নিয়ে কাজ করে আসছিল। এ বছরের সেপ্টেম্বরে এই গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। এ গবেষণায় বাংলাদেশের জন্য ২০৫০ সালের মধ্যে শতভাগ নবায়নযোগ্য জ্বালানী ব্যবহারকেই সবচেয়ে সাশ্রয়ী হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই গবেষণা অনুসারে শতভাগ জ্বালানী নবায়নযোগ্য উৎস হতে সংস্থান করা হলে ২০৫০ সালে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম হবে ৯ টাকা এবং তা মাথাপিছু ২ হাজার টাকা পর্যন্ত সাশ্রয় করবে ( Jacobson et al. 2017 )। বোঝাই যাচ্ছে সরকার এবং সরকারের বাইরে যে গুটিকয় মানুষ নবায়নযোগ্য জ্বালানীর বিরোধীতা করছেন তাঁদের বিরোধীতার পেছনে বিজ্ঞানসম্মত কোন যুক্তি নেই। বরং নানা স্বার্থের জালে বন্দী হবার ফলেই তাঁরা স্বাধীন চিন্তা করার ক্ষমতা হারিয়েছেন।  

বর্তমানকালে বিদ্যুৎ প্রাপ্তিটাই মুখ্য নয়, বরং এই বিদ্যুতের মান এবং দামও একই সাথে গুরুত্বপূর্ণ। সোনার দামে বিদ্যুৎ কে কিনতে চায়! কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে বাংলাদেশ সে পথেই হাটছে। পিএসএমপি-২০১৬ অনুসারে ২০১৩ সালের দামস্তর অনুযায়ী ২০২১, ২০৩১ আর ২০৪১ সাল নাগাদ প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম হবে যথাক্রমে ৮.৫২, ১১.০২ এবং ১২.৭৯ টাকা। অথচ জীবন-জীবিকা আর পরিবেশের ক্ষতি না করে নবায়নযোগ্য জ্বালানী কেন্দ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদনী ব্যবস্থায় এর চেয়ে অর্ধেক দামে বিদ্যুৎ পাওয়া সম্ভব। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন গণমুখী নীতি প্রণয়নের। সর্বজনের স্বার্থ সম্পর্কহীন অসৎ ব্যবসায়িক দুষ্টচক্রের সাথে অদূরদশী নীতিনির্ধারণী মহলের আঁতাত একটি খাতকে কতটা নষ্ট করতে পারে তা বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের দিকে তাকালেই স্পষ্ট বোঝা যায়। চলতে থাকা এই অনিয়মের চূড়া পদানত করে ভবিষ্যত বিদ্যুৎ খাতকে জনবান্ধব করে গড়ে তুলতে দফায় দফায় দাম বৃদ্ধির ক্ষতের যন্ত্রণা স্মরণে রাখা খুব জরুরী।

লেখক: প্রকৌশলী ও গবেষক

আপনার মন্তব্য

advertisement