অন্যকে জানাতে পারেন:

First memorial place of freedomfight
মুক্তিযুদ্ধের প্রথম জাদুঘর, ছবি : বাংলা

সবুজ-সমরোহে ঘেরা মতিহারের ৭৫৩ একক বুক জুড়ে দাঁড়িয়ে আছে বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রাচীন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। যার রয়েছে গৌরবগাঁথা অতীত। বহুল বীরত্বগাঁথা স্মৃতিসমৃদ্ধ এ বিশ্ববিদ্যালয়টি নানা কারণেই সৌন্দর্য্য পিপাসুদের পছন্দের শীর্ষে থাকে—প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য, স্থাপত্যশৈলী, দেশের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে বিশ্ববিদ্যালয়টির অবদান ও স্মৃতি নিদর্শনচিহ্ন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক পথে প্রবেশ করে হাতের বামে তাকালেই চোখে পড়ে ‘সাবাস বাংলাদেশ’। সামনে সুদৃশ্য প্রশাসনিক ভবন ও শহীদ ড. শামসুজ্জোহা’র মাজার। যিনি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের কাছে অনুসরণীয়, অনুকরণীয়। ড. জোহার মাজার থেকে হাতের ডান দিকে কয়েকশো গজ হাঁটলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ, পাশে শহীদ মিনার। শহীদ মিনারের পাদদেশেই ঠাঁই দাঁড়িয়ে আছে, বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রথম জাদুঘর ‘শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা’।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের চির-গৌরবোজ্জ্বল স্মৃতিকেন্দ্র শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালা। ৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে দেশের প্রতিটি আন্দোলন-সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদের স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে গড়ে ওঠে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক প্রথম স্মৃতি সংগ্রহশালাটি।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের যেসকল শিক্ষক-শিক্ষার্থী-কর্মকর্তা-কর্মচারী ৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছেন, শহীদ হয়েছেন তাদের স্মৃতি নিদর্শন যত্নসহকারে সংরক্ষণ করার উদ্দেশ্যে ১৯৭৬ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পথচলা শুরু করে এ সংগ্রহশালাটি। প্রাথমিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রিক হলেও পরে তা দেশব্যাপী বিস্তার লাভ করে। শিল্পী ফণীন্দ্রনাথ রায়ের নির্মিত শহীদ মিনারের মুক্তমঞ্চের গ্রিন রুমে গড়ে ওঠে স্মৃতি এ রক্ষণাগার। নির্ধারিত স্থান না থাকায় বছরের বিশেষ দিনগুলোতে এটি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করা হতো। ওই বছরের ৬ মার্চ বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন শিক্ষা উপদেষ্টা আবুল ফজল সংগ্রহশালাটির প্রথম উদ্বোধন করেন। এরপর ১৯৮৯ সালের ২২ মার্চ তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক আমানুল্লাহ আহমদ মূল ভবনের ভিত্তি স্থাপন করেন।

 শিল্পী ফণীন্দ্রনাথ রায়ের নির্মিত মুক্তমঞ্চ

পরে ছয় হাজার ছয়’শ বর্গফুট জায়গা জুড়ে তিনটি গ্যালারি বিশিষ্ট এ সংগ্রহশালাটির মূল অবকাঠামো নির্মিত হয়। তিন শহীদ পত্নী বেগম ওয়াহিদা রহমান, বেগম মাস্তুরা খানম ও শ্রীমতি চম্পা সমাদ্দার দর্শনার্থীদের জন্য এর স্থায়ী গ্যালারি উন্মুক্ত করেন, ১৯৯০ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। সেই থেকে বর্তমান অবধি দেশ বিদেশে বাংলাদেশভিত্তিক নমুনা সংগ্রহের কাজ চলমান রয়েছে।

সংগ্রহশালায় ৫২, ৬৬, ৬৯,ও ৭১সহ বাঙ্গালির সকল আন্দোলন-সংগ্রামের নিদর্শন পর্যায়ক্রমে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছে। দেশের স্বাধীনতা অর্জনে অবদান রাখা অনেক ব্যক্তির ছবি সংরক্ষিত করা আছে এতে। একটি গ্যালারিতে রয়েছে ১০৮টি আলোকচিত্র, ৩৫টি প্রতিকৃতি, ৯টি শিল্পকর্ম এবং বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ, শহীদ শিক্ষকদের প্রতিকৃতি, ’৭১-এর গণবিক্ষোভ ও বীভৎস গণহত্যার দুর্লভ ছবি। আরেকটিতে রয়েছে ১১২টি আলোকচিত্র, ৪০টি ডায়েরি-পাণ্ডলিপি, পোষাক ও ৫৬টি ঐতিহাসিক জিনিসপত্র। মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ, রণাঙ্গনে গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা, বিজয়ী মুক্তিসেনা, হানাদারমুক্ত ঢাকা শহর, গণকবর, বুদ্ধিজীবী হত্যা, রায়েরবাজার বধ্যভূমি, মুক্তিযুদ্ধে ব্যবহৃত বিভিন্ন অস্ত্র (মাইন, বুলেট, রকেট লাঞ্চার ইত্যাদি), শহীদ বুদ্ধিজীবী ও শহীদ সাংবাদিকদের ছবিসহ বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে একটি আলাদা বোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয়ের গণকবর থেকে প্রাপ্ত নাম জানা অজানা শহীদের ব্যক্তিগত তথ্য ও জিনিসপত্র।

শহীদ বুদ্ধিজীবী মুনীর চৌধুরী, মোস্তফা চৌধুরী, রাশিদুল হাসান, সিরাজউদ্দিন হোসেন প্রমুখের প্রতিকৃতি এবং আমিনুল ইসলাম, মোস্তফা মনোয়ার, রফিকুন্নবী, হাশেম খান, রশিদ চৌধুরী ও দেবদাস চক্রবর্তীসহ বাংলাদেশের প্রধান প্রধান চিত্রশিল্পীদের চিত্র, ’৭১ সালে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয়োল্লাসের কিছু স্থিরচিত্র, শিল্পী কামরুল হাসানের অঙ্কিত মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন পোস্টারও সংরক্ষিত আছে এ স্মৃতি সংগ্রহশালায়। এছাড়াও রয়েছে ‘মুক্তমঞ্চ’ নামে নির্দিষ্ট একটি মঞ্চ। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো নিয়মিত নাট্য মঞ্চস্থ করে থাকে।

সংগ্রহশালাটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল মুক্তিযুদ্ধে অনুপ্রাণিত বেশকিছু তৈলচিত্র, ছাপচিত্র ও জলরঙ ছবির সংগ্রহ। ফলে দেশ ছাড়িয়ে পৃথিবীর অনেক দেশের দর্শনার্থী এখানে ঘুরতে আসেন। প্রতিদিন প্রায় দুই থেকে তিনশ দর্শনার্থীর ভীড় হয় এ সংরক্ষণাগারটিতে। সংগ্রহশালাটি পরিচালনায় ১৬ সদস্যবিশিষ্ট একটি পরিচালনা কমিটি রয়েছে। ক্ষমতাধিকার বলে বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য এ কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন।

শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালার তত্ত্বাবধায়ক ড. মো. শফিকুল ইসলামের কথায়ও উঠে আসে এর তাৎপর্য। তিনি জানান, রাজশাহী বিশ^বিদ্যালয়ের যে সমস্ত শিক্ষক-ছাত্র-কর্মকর্তা-কর্মচারী মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেছিলেন এবং শহীদ হয়েছিলেন তাদের স্মৃতি নিদর্শনকে ধরে রাখার জন্য ১৯৭৬ সালে ২৩ মার্চ তৎকালীন উপাচার্য একটা কমিটি গঠনের মাধ্যমে উদ্যোগ গ্রহণ করেন। প্রথমিক পর্যায়ে যদিও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা শহীদ হয়েছিলেন তাদের জন্য করা হয় কিন্তু পরবর্তী সময়ে সারা বাংলাদেশে মহান একুশে ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু করে বিভিন্ন আন্দোলন সংগ্রাম ও সর্বশেষ মহান মুক্তিযুদ্ধে যারা শহীন হয়েছিলেন তাদের স্মৃতি নিদর্শনকে সংরক্ষণ করা হচ্ছে এ শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালায়। বর্তমানে এটিকে নতুন করে সাজিয়ে আধুনিকায়ন করা হয়েছে।’

‘বাংলাদেশের সকল আন্দোলনের লিখিত দলিলস্বরূপ ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৭১-এর ওপর প্রায় তিন হাজার কপি বই, গ্রন্থমালা, পুস্তিকা, ইশতেহার ও সংকলনে একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি গড়ে তোলা হয়েছে। পাশাপাশি তৎকালীন বিভিন্ন পত্রিকা বাঁধাইকৃত এবং ভাষা আন্দোলন, গণআন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক পত্রিকার কাটিং ফাইল রয়েছে। যারা এসব আন্দোলন তথা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণা করতে চায় এই লাইব্রেরি তাদের গবেষণায় অন্যতম সহায়ক হিসেবে কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান সংগ্রহশালার ড. শফিকুল ইসলাম।’

সংগ্রহশালাটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১জন কিউরেটর, ৩জন কর্মকর্তা ও ২৩জন সাধারণ কর্মচারীসহ মোট ২৭জন কর্মরত রয়েছেন। এছাড়া রয়েছে তিনজন প্রহরী। বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যদিবস মেনেই সকাল ৯ টা থেকে বিকেল ৫টা অবধি দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়। তবে এর ভিতরে যেকোনো ধরনের ছবি তোলা নিষিদ্ধ রয়েছে।

‘নতুন প্রজন্ম যারা আসবে, মুক্তিযুদ্ধে মহান শহীদের যে অবদান-ত্যাগ তারা এটা দেখবে, উপলব্ধি করবে। দেশ মাতৃকার ওপরে তাদের যেন প্রেম বাড়ে, তারা যেন দেশকে ভালবাসতে শেখে, সম্মান করতে শেখে সে উদ্দেশ্যেই এই সংরক্ষণাগার করা হয়েছে।’ বাঙ্গালি হিসেবে গর্ব করতে, বাংলাদেশকে চিনতে-জানতে-বুঝতে-উপলব্ধি করতে একবার হলেও ঘুরে আসা চাই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ স্মৃতি সংগ্রহশালায়।

আপনার মন্তব্য

advertisement