অন্যকে জানাতে পারেন:

Surendra Kumar Sinha
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা। ছবি: সংগৃহীত

বদরুদ্দীন উমর


সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে কেন্দ্র করে যে নাটকসম কাণ্ডকারখানা কিছুদিন ধরে চলছে, তাতে দুনিয়ায় বাংলাদেশের মর্যাদা ওপরে ওঠার কথা নয়। উল্টো তা ক্ষুণ্ন হওয়ার কথা এবং বাস্তবতঃ তাই হচ্ছে। বিচার বিভাগকে নিয়ে যা কিছু ঘটছে এটা শুধু বিচার বিভাগের গুরুত্বকেই খর্ব করছে না, বাংলাদেশের সংবিধানকে শিকেয় তুলে শাসন কাজ পরিচালনার ব্যবস্থা হচ্ছে। এর মধ্যে শাসক শ্রেণির সরকারের গৌরবের কিছু নেই। কারণ এর দ্বারা জনগণের তো কোন লাভ হয়ই না, উপরন্তু তা শেষ পর্যন্ত সমগ্র শাসন ব্যবস্থাকে এমনভাবে সংকটে নিক্ষিপ্ত করে, যাতে সে সংকট শাসক শ্রেণি ও সরকারকে রেহাই দেয় না।

শাসক শ্রেণির চরিত্র যাই হোক, দেশের শাসন কাজ পরিচালনার জন্য তাদের নিজেদেরই দ্বারা প্রণীত কিছু মৌলিক রীতিনীতি অনুযায়ী তাদেরকে চলতে হয়। বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এই মৌলিক নীতিই ১৯৭২ সালের সংবিধানে লিপিবদ্ধ হয়েছিল।

কিন্তু দেখা যাবে যে, নিজেদের দ্বারা প্রণীত সংবিধান অক্ষত রাখা শাসক শ্রেণির নিজের পক্ষেই সম্ভব হয়নি। পার্লামেন্টে পরপর চারটি সংশোধনী পাশ করে তারা সংবিধানের এমন অবস্থা করেছিল, যাতে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার বলতে আর কিছু থাকেনি।

এই অবস্থা এত অল্প সময়ের মধ্যে কেন এমন দাঁড়িয়েছিল, এ নিয়ে কোন উল্লেখযোগ্য আলোচনা বা গবেষণা তো হয়ই নি, উপরন্তু সে বিষয়ে বিশেষ কোন উচ্চবাচ্যও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও পর্যবেক্ষক নামে পরিচিত লোকদের দ্বারা হয়নি। কিন্তু তা সত্ত্বেও এ প্রসঙ্গে বলা যায় যে, ১৯৭২ সালে বাংলাদেশের শাসক শ্রেণি এমন এক সংবিধান প্রণয়ন করেছিল, যা তাদের শ্রেণিচরিত্র ও শ্রেণিশাসনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। কাজেই সংবিধানকে তৎকালীন শাসন প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য সংবিধান প্রণয়নকারীরা নিজেরাই অল্পদিনের মধ্যে চারটি সংশোধনীর মাধ্যমে তাকে নিজেদের উপযোগী করার চেষ্টা করেছিল।

সংবিধানে প্রশাসন, আইন ও বিচার বিভাগের ক্ষমতা পৃথককরণের কথা বহাল থাকলেও চতুর্থ সংশোধনীর পর বিচার বিভাগ কার্যত অপ্রাসঙ্গিক হয়েছিল। প্রধানমন্ত্রীর হাতে সর্বময় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়ে বাংলাদেশ এমন এক রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছিল, যেখানে নাগরিকদের কোন অধিকারই আর নিশ্চিত ছিল না। এদিক দিয়ে বলা চলে যে, বাংলাদেশে সাংবিধানিক শাসন প্রায় প্রথম থেকেই বেশ বড় ধরনের সংঘর্ষের মধ্যে নিক্ষিপ্ত হয়েছিল। ১৯৭৫ সালে আওয়ামী-বাকশালী সরকারের পতনের পর জিয়াউর রহমান এবং এরশাদের সামরিক শাসন ও ১৯৯০-এর পরে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের শাসনামলে একের পর এক সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশের সংবিধানের অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, যাতে মনে হয় এই সংবিধান অমান্য করে শাসন কাজ পরিচালনায় কোন অসুবিধা আর নেই।

সংবিধান এখন শাসন পরিচালনার মৌলিক ভিত্তির পরিবর্তে হয়ে দাঁড়িয়েছে নামমাত্র এক কাগুজে ব্যাপারে। এ জন্য নানাভাবে সংবিধান লঙ্ঘিত হতে থাকা সত্ত্বেও এর জন্য কাউকে পাকড়াও করা বা উপযুক্ত শাস্তি দেওয়ারও কেউ নেই। কারণ যারা রক্ষক তারাই পরিণত হয়েছে ভক্ষকে। বাংলাদেশে এখন বেড়ায় ধান খাচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকার আদালতকে বাস্তবত জাতীয় সংসদের অধীন করার জন্য সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী পাশ করেছিল। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে অন্য বিচারপতিরা সর্বসম্মতিক্রমে সেই সংশোধনী বাতিল করেছেন সংবিধানে প্রদত্ত বিচার বিভাগের স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রাখার উদ্দেশ্যে। এ অধিকার দেশের শীর্ষ আদালতের অবশ্যই আছে। তবে এতে যদি সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ কিছু থাকে, তাহলে তা নিয়ে আইনসম্মত লড়াইয়ের ব্যবস্থাও সংবিধানে আছে। যে কোন গণতান্ত্রিক সরকারের তাই করা উচিত।

বলা হয়েছে যে, ষোড়শ সংশোধনী বাতিল সম্পর্কিত রায় প্রদানকালে আদালত অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতি কিছু পর্যালোচনা করেছেন, যা আপত্তিকর অর্থাৎ সরকারের কাছে অগ্রহণযোগ্য। সেটা হলেও তা নিয়ে আদালতের কাছেই যাওয়া দরকার। তার বাইরে কিছুই করা সঙ্গত নয়। কিন্তু বাংলাদেশ সে রকম কোন দেশ নয়, যেখানে ক্ষমতাসীন দল, রাজনৈতিক ব্যক্তি অথবা তাদের ঘরাণার বুদ্ধিজীবীরা কোন্টা সংগত এবং কোন্টা অসঙ্গত, তার বিচার করতে আগ্রহী।

এখানে ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতিই সব সরকারের আমলে কার্যকর হয়ে আসছে। বর্তমান সরকারও এদিক দিয়ে কোন ব্যতিক্রম নয়। কাজেই ষোড়শ সংশোধনীর ওপর সুপ্রিম কোর্টের রায় প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই আওয়ামী লীগ সরকারের লোকেরা ক্ষিপ্ত হয়ে প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে এমন সব কথা বলছেন এবং তা সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে, যা কোন গণতান্ত্রিক সমাজে হওয়ার কথা নয়। হয়ও না। তাঁকে ব্যক্তিগতভাবেও এমন সব গালি দেওয়া হচ্ছে, যা স্পষ্টতই আদালত অবমাননার অতি নিকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আদালত কিছুই করছেন না। তাঁর কিছু করার ক্ষমতাও এখন বাস্তবত নেই। এর ফলে শুধু প্রধান বিচারপতিই নন, শীর্ষ আদালতের মর্যাদাও এমনভাবে ভূলুণ্ঠিত করা হচ্ছে, যার কোনো উদাহরণ বিশ্বের অন্য কোন দেশে নেই। প্রধান বিচারপতিকে ইচ্ছামতো গালাগাল করা এখন হয়ে দাঁড়িয়ে  free for all -এর মতো এক ব্যাপার। এভাবেই বাংলাদেশের শাসক শ্রেণি নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থ রক্ষার জন্য নিজেদের দেশের শীর্ষ আদালতকে পরিণত করেছে একটি এতিম প্রতিষ্ঠানে! এর মাধ্যমে নিজেদের সংবিধানকেও তারা এমনভাবে পদদলিত করেছে, যা বিস্ময়করই বটে!

প্রধান বিচারপতির প্রতি চরম অপমানজনক আচরণ ক্ষমতাসীনদের নিম্ন থেকে নিয়ে উচ্চতম পর্যায় পর্যন্ত চলতে থাকায় অতিষ্ট হয়ে তিনি দেশের বাইরে গিয়েছিলেন। ফিরে এসে তাঁর কাজে যোগ দেওয়ার কথা। কিন্তু তিনি ফিরে আসার আগে থেকেই ক্ষমতাসীন দলের লোকজন, এমনকি তাদের অনুগত সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি পর্যন্ত বলতে থাকেন যে, প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে আর তার কাজে যোগ দিতে না দিয়ে বিদায় করা দরকার! বাস্তবতঃ দেখা গেল, তিনি ছুটি শেষে ঢাকায় ফেরার পর তাঁর বাসায় উচ্চ পর্যায়ের সরকারি লোকেরা ঘন ঘন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে থাকলেন এবং তিনি কাজে যোগ না দিয়ে এক মাসের ছুটি নিলেন।

তাঁর অবসর গ্রহণের সময় ২০১৮ সালের জানুয়ারির শেষে। তিনি এক মাসের ছুটি শেষ হওয়ার পরও যাতে আর প্রধান বিচারপতি হিসেবে কাজে যোগ না দিতে পারেন, তার ব্যবস্থা ও তার জন্য প্রচার-প্রচারণাও শুরু হলো, যা এখনও চলছে। এই পরিস্থিতিতে প্রধান বিচারপতি অস্ট্রেলিয়ায় তাঁর কন্যার কাছে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

শোনা যাচ্ছে, অস্ট্রেলিয়ায় তাঁর তিন বছরের ভিসা হয়েছে এবং কয়েক দিনের মধ্যেই তিনি সেখানে রওনা হবেন। এই যাত্রার প্রকৃত অর্থ উপলব্ধি করে আওয়ামী ঘরাণার এক অতি বিশ্বস্ত বুদ্ধিজীবী পর্যন্ত বলেছেন যে, এটা হলো প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র সিনহার অগস্ত্যযাত্রা!

এর থেকে বোঝা যায় যে, বাংলাদেশ এখন যে অবস্থায় আছে তার থেকে আরও খারাপ অবস্থার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আদালত যতই সরকার ও প্রশাসনের প্রভাবের অধীন থাকুক, এটাই একমাত্র প্রতিষ্ঠান, যেখানে অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে দেশের নাগরিকদের শেষ চেষ্টা করার একটা সুযোগ আছে। কিন্তু বাংলাদেশে এখন আদালতের যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে, তাতে জনগণের সে সুযোগও আর থাকছে না।

ষোড়শ সংশোধনী বাতিল প্রসঙ্গে সরকারের অর্থমন্ত্রী অতি দম্ভের সঙ্গে একাধিকবার ঘোষণা করেছেন, তাঁরা জাতীয় সংসদে আবার ষোড়শ সংশোধনী পাস করাবেন! শুধু তাই নয়, তারপর যতবার সুপ্রিম কোর্ট এই সংশোধনী বাতিল করবেন, ততবারই তাঁরা আবার সেটা জাতীয় সংসদে পাস করবেন!! শীর্ষ আদালত সম্পর্কে অন্য কোন দেশের শীর্ষস্থানীয় কোন সরকারি লোক কখনও এ ধরনের আস্ফালন করেছেন বলে জানা নেই। কিন্তু অন্য কোন দেশে যা হয়নি বা হয় না, সেটা এখন আমাদের দেশেই ঘটছে।

বাংলাদেশ নাকি এখন আন্তর্জাতিক মহলে গৌরবের পর গৌরব অর্জন করছে! কিন্তু এখানে আদালত, এমনকি শীর্ষ আদালতের মর্যাদা যেভাবে ক্ষুণ্ন করা হলো এবং প্রধান বিচারপতিকে যেভাবে অপমানিত করে বিদায় দেওয়ার ব্যবস্থা হলো, তার মধ্যে গৌরব করার মতো কিছু নেই।

রাজনীতিবিদ ও লেখক

আপনার মন্তব্য

advertisement