che in latinamerica after 50 years
চে গুয়েভারা, ছবি : সংগৃহীত

আজ চে গুয়েভারার ৫০ বছর মৃত্যুবার্ষিকী। বিপ্লবীদের রক্ত গরম করা আর আশাজাগানিয়া এক নাম এই গুয়েভারা। যেখানেই অন্যায়, জুলুম চলে সেখানেই হানা দিতে চান চে। সারাবিশ্বে বিপ্লবীদের কাছে তিনি কিংবদন্তী হলেও তারা যাত্রা কিন্তু লাতিন আমেরিকায়। তিনি একাই কাঁপিয়ে দিয়েছেন পুরো লাতিন আমেরিকাকে। কিন্তু আজকের লাতিন আমেরিকায় কতটা আছে চের প্রভাব? সেই অবস্থা দেখতেই তাঁর শেষ বিচরণভূমিতে গিয়েছিলেন গার্ডিয়ানের দুই প্রতিবেদক লরেন্স ব্লেয়ার ও ড্যান কলিন্স। তাঁদের সেই অভিজ্ঞতা নিয়েই প্রতিবেদন

পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে বিপ্লবের জন্য যে স্থানটিতে এক মহাবিপ্লবীর প্রাণ গেল মৃত্যুর ৫০ বছর পর সেই জায়গা এখন ছোটখাটো পুঁজির দোকান। বলিভিয়ার লা হিগুয়েরার গ্রামটিতে বেশ কয়েকটি মোটেল গজিয়েছে। চে ও তাঁর সহযোদ্ধাদের গণকবরে গেলে মিলবে ছোটখাটো চে ইন্ডাস্ট্রি। পর্যটকদের ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে চের শেষ মুহূর্তের স্থানগুলো দেখায় তারা। তাদের আয়-রোজগার ভালোই হচ্ছে চে‘র কল্যাণে।

যে স্কুলঘরে চেকে গুলি করে মারা হয়, সেটার রক্ষণাবেক্ষণকারী বললেন, ‘চে এখানে না এলে আমাদের কারো চাকরিবাকরি থাকত না।’ আরো জানালেন, স্কুলঘরটায় ঢুকলেই দেখবেন উপচে পড়ছে চে-ভক্তদের রেখে যাওয়া শ্রদ্ধাঞ্জলি। ভ্যালেগ্রান্দের গণকবরে এ যাত্রায় পর্যটন বাণিজ্য জমবে বেশ। ধারণা করা হচ্ছে, হাজার দশেক মানুষ তো আসবেই।

চের জীবনটাকে যাঁরা বিপ্লবের মহাকাব্য না ভেবে স্রেফ প্রতীক প্রতীক বলে মুখে ফেনা তোলেন, তাঁদের মধ্যে এখন ঘোরতর কলহ। অনেকের কথা হলো, এই যে চেকে ঘিরে এত এত ব্র্যান্ডিং, ফ্যাশনের ফুলঝুরি—এসবও কিন্তু ব্যর্থ বিপ্লবের প্রতীক বলেই মানতে হয়। লাতিন আমেরিকার দিকে দেখুন। চের সময়টা এখন মিইয়ে গেছে। মৃত্যুর ৫০ বছরে চেকে নিয়ে যতটা চেয়েছিলেন ভক্তরা, সম্ভবত তার সিকিভাগও মিলছে না এখন। কলহ থামেনি চের আদর্শ নিয়ে। তবে কলহটা কোন্দলের পর্যায়ে যাওয়ার সুযোগ বোধ হয় এখন আর নেই বললেই চলে।

পুরনো বাতিল একটি এয়ারস্ট্রিপে চের মৃত্যুর ৫০ বছর উদ্‌যাপনের আয়োজন করা হয়েছে। চে গুয়েভারা কালচারাল সেন্টারটিকে সাজানো গোছানোর কাজ চলছে পুরোদমে। কিন্তু বিপ্লবের সেই রোমান্টিক ছটা নেই। পাঁচ বছর হয়ে গেল বলিভিয়াসহ আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও প্যারাগুয়ের ক্ষমতার বলয় লেফট-রাইট লেফট-রাইটের বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। পাল্লা আপাতত ডানেই ভারী। ভেনিজুয়েলার প্রয়াত হুগো শাভেজও চেয়েছিলেন চের একক সংযুক্ত সমাজতান্ত্রিক মহাদেশের স্বপ্নটাকে ফের ঝালিয়ে নিতে। কিন্তু সেই দেশটাকে এখন ভুগতে হচ্ছে ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও খুনখারাবি নিয়ে। গুয়েভারার সামাজিক বিপ্লবের সংঘাতসংকুল পথটাও দিনে দিনে ‘আউট অব ফ্যাশন’ হচ্ছে। কয়েক দশক ধরে মিলছে তার উদাহরণ।

জীবিত অবস্থায় চে গুয়েভারার শেষ ছবি

এ বছরই আগ্নেয়াস্ত্র ভারী ঠেকলো রেভুল্যুশনারি আর্মড ফোর্সেস অব কলম্বিয়ার (এফএআরসি) কাছে। ৫৩ বছরের সসস্ত্র সংগ্রাম শেষে অস্ত্র জমা দিল ওরা। দিতে অবশ্য বাধ্যই হয়েছিল বলা চলে। ২০১৬ সালের এক গণজরিপে ১ শতাংশ ভোটও পায়নি দলটি। এখন বুঝতে পেরেছে, সময়ে সময়ে বুলেটের চেয়ে ব্যালটটাই বেশি দরকারি হয়ে ওঠে। তাদের ছত্রচ্ছায়ায় থাকা ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি কলম্বিয়া (ইএলএন) এখন একেবারে চুপ।

পেরু, প্যারাগুয়ে, কলম্বিয়ার বিচ্ছিন্ন গ্রুপগুলো বিপ্লব থেকে যোজন যোজন দূরে। তাদের একাংশ নাকি এখন মাদক কারবার নিয়ে ব্যস্ত। মাদক আর মুক্তিপণের টাকায় চলছে টুকটাক অস্ত্র কেনা। গত বছরের আগস্টে প্যারাগুয়ের পিপলস আর্মির ছোট্ট একটি দল হামলা চালিয়ে দেশটির আট সেনা সদস্যকে হত্যা করলেও পরের মাসেই তাদের অনেককেই প্রাণ হারাতে হয় পাল্টা জবাবে। দলটি এখন জাতীয় হুমকি নয়, স্থানীয় গ্যাং মাত্র। পেরুর একসময়কার রোমাঞ্চ জাগানিয়া বিপ্লবী গোষ্ঠী শাইনিং পাথের বেশির ভাগ নেতা এখন জেলে। দলে সদস্য আছে মোটে ৩০০। মেক্সিকোর জাপাতিস্তা মুভমেন্টের নেতারাও সহিংসতার পথ ছেড়ে আসার ঘোষণা দিয়েছেন সম্প্রতি। দেশটির সহিংস গোষ্ঠী ইপিআরও এখন তাদের নজর অস্ত্র থেকে সরিয়ে সামাজিক আন্দোলন ও প্রতিবাদসভার দিকে দিয়েছে।

চে গুয়েভারার মৃত্যুর পর

চে গুয়েভারার সতীর্থরাও যে একে একে হার স্বীকার করলেন। শেষের দিকে এসে তাঁদের শত্রু আর সিআইএ ছিল না, ছিল বয়স! ২০১৩ সালে হুগো শাভেজ আর গত বছরের শেষে মারা যান ফিদেল কাস্ত্রো। নব্বইয়ের ঘরে পা দেওয়া ভাই রাউল কাস্ত্রোও বলেছেন, আগামী বছরে অবসরে যাচ্ছেন তিনি।

মাঝে মাঝে লাতিন আমেরিকার রাস্তায় আগুনঝরা প্রতিবাদ মিছিল দেখা গেলেও মার্কিন জরিপ বলছে, দেশগুলোর নতুন প্রজন্মের মনোজগতে বেশ পরিবর্তন এসেছে। তারা সহিংসতা চায় না। পুরনোদের (যেমন চে গুয়েভারা) বদলে তারা নাকি ইদানীং উত্তর আমেরিকার সুপারপাওয়ারকেই উপযুক্ত মনে করছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের কারণে আঞ্চলিক সম্পর্কে লাতিন আমেরিকা ও যুক্তরাষ্ট্রের মাঝে একটা গ্রেটওয়াল গজালেও ব্রাজিলীয় তরুণদের ৭২ শতাংশ এখন আমেরিকাকে ইতিবাচক চোখে দেখে (পিউ রিসার্চ সেন্টার)।

অর্থাৎ সেই বিপ্লবের রেশ আর নেই। শিগগিরই আসার লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। বলিভিয়ার নাগরিক গঞ্জালো গুজমানদের মতো চেকে নিয়ে বিভ্রান্ত লোকের সংখ্যাও যে নেহাত কম নয়। চের দেহাবশেষ আবিষ্কার করে আচমকা ‘ইতিহাসে’র অংশ হয়ে যাওয়া গুজমান এখন কাজ করছেন চে পর্যটনের একজন গাইড হিসেবে। নিজেকে চের ভক্ত বললেও তিনি যে অভিযোগ করলেন, তা অনেকটা বুমেরাং হয়েই ফিরে আসে। গুজমানের মতে, ভালেগ্রান্দের স্থানীয় রাজনীতিকরা চের ব্যাপারে বড্ড উদাসীন। মোরালেসের (ইভো মোরালেস) বিপক্ষে থাকা ওই রাজনীতিকরা চে সংক্রান্ত পর্যটনের জন্য তেমন কিছুই করেনি। আবার স্থানীয় এক কাউন্সিলের কথা হলো, ‘বাইরে কী হচ্ছে না হচ্ছে সে কথা ছাড়ুন। যে গেরিলারা (চের বাহিনী) ছিল একসময়কার সেনাবাহিনীর এক নম্বর শত্রু, তাদের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনে বাধ্য করায় বলিভিয়ার সামরিক বাহিনীর সদস্যরাও কিন্তু প্রতিবাদ করেছে।’

মোদ্দাকথা, চে গুয়েভারা কিংবা তাঁর সতীর্থদের কাছে আপাতত সরাসরি অনুকরণীয় কিছু পাচ্ছে না ৫০ বছর পরের ভক্তরা। তাদের কেউ কেউ ভাবছে, চের মূর্তিটাকে মাঝে মাঝে ঝাড়পোঁছ করা হলেই বুঝি চের মান বাঁচে।

বলিভিয়ার ভ্যালেগ্রান্দেতে চে গুয়েভারার স্মৃতিস্তম্ভ

বিপ্লব নিয়ে লাতিন আমেরিকার মনোজগতে এমন পরিবর্তনের কারণ কী? অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের লাতিন আমেরিকা সেন্টারের গবেষক ম্যালকম দিয়াসের মতে, আড়ালে থেকে বিপ্লবের ব্যারোমিটারটা আগাগোড়া নিয়ন্ত্রণ করছে অর্থনীতি। এফএআরসিই ছিল চে কিংবা কাস্ত্রোর অনুপ্রেরণায় চলা বড় গেরিলা বাহিনী। তাদের অস্ত্র সমর্পণেই যে গেরিলা কাজকর্ম পুরোপুরি থেমে যাবে তা নয়। তবে বড় ধরনের গৃহযুদ্ধের আশঙ্কা করাটা অত্যুক্তি। ছোটখাটো বাহিনীগুলোর কাজকর্ম খুবই সীমিত পরিসরে। এগুলো এখন আর শহুরে জীবনে প্রভাব ফেলে না মোটেও। এ দেশে যারা এখন আছে, তারা কখনো বলবে না যে গেরিলারা আমাদের সমস্যা করছে। মানুষ এখন এসব নিয়ে ক্লান্ত। তবে গুয়েভারিস্তা আন্দোলন নিয়ে লিখে খ্যাতি কুড়ানো লেখক হেক্টর উরদায়েতার মতো কয়েকজনের কাছে চে এখন ঠিক আগের চেই আছেন।

চে সফল কি ব্যর্থ, এমন প্রশ্নের কৌশলী জবাবে বললেন, ‘এটা নির্ভর করছে আপনি সফলতাকে কিভাবে মাপবেন তার ওপর। ভবিষ্যতে কোনো না কোনো সশস্ত্র বিপ্লবের সম্ভাবনা আমরা উড়িয়ে দিতে পারি না। আপনি চেকে দমিয়ে রাখতে পারবেন না। আমাদের কাছে সে এখনো নায়ক।’

আপনার মন্তব্য

advertisement