অন্যকে জানাতে পারেন:

shoma datta

সোমা দত্ত


করিম মিয়া আজ সকাল থেকেই বেশ ব্যস্তসমস্ত হয়ে ছোটাছুটি করছেন। সমস্ত কিছুর তদারকি নিজ হাতেই করে যাচ্ছেন। তাঁর সামর্থ্য মত আয়োজনে কোনরকম ত্রুটি রাখতে চান না তিনি। আবার এই অসময়ে বেশী খরচে মনটাও সায় দেয় না ঠিক! তাই আড়ম্বতার রেশটুকুও রাখেননি। কিন্তু, কি বা করার আছে তাঁর, তিনি তো নিরুপায়! এসব ভাবতে ভাবতেই আশেপাশের পাঁচ-দশটা গ্রামের বানভাসি মানুষের করুণ মুখগুলো চোখের সামনে ভেসে ওঠে করিম মিয়ার।

বেলা একটু গড়াতেই কাছাকাছি থাকা দুই ঘর আত্মীয় আর পাড়া প্রতিবেশীদের আনাগোনা শুরু হয়ে যায় বাড়িতে। বাইরের গ্রাম আর শহর থেকে অন্য আত্মীয়স্বজনরা তেমন একটা আসতে পারেনি, বন্যার কারণে। বাড়িতে আজ একটা বিশেষ দিন। করিম মিয়ার অতি আদরের ছোট মেয়ে রেবার আজ বিয়ে। তিন বোন আর তিন ভাইয়ের মধ্যে রেবার পরে আরেক ভাই, সে এবারে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছে।

ছোট বেলা থেকেই খুব শান্তশিষ্ট আর সহনশীল মেয়ে রেবা। তাঁর এই স্বভাবের কারণেই বাড়ি ছাড়াও এই গ্রামের সবাই তাকে খুব পছন্দ করে। মা-বাবার কাছে তো রেবা একেবারে লক্ষীমন্ত পয়া মেয়ে। রেবার জন্মের পর থেকেই তো করিম মিয়ার গৃ্হস্থালি পরিপূর্ণতা পেতে থাকে। গ্রামের সকলেও তাই মানে! করিম মিয়ার তিন মেয়ের মধ্যে রেবাই প্রথম বিএ পাস, তাই এই ছোট মেয়ের জন্য গর্বের বোধটা তাঁর একটু বেশীই।

সুন্দরগঞ্জ গ্রামটা এর নামের মতই সুন্দর। ফসলী আবাদি জমির মান আর দশটা গ্রামের চাইতে বেশ উঁচু মানের। ধান, পাট, ভুট্টা ছাড়াও বেশ কয়েক বছর হলো শীতকালীন ও বারোমাসি সবজী চাষ শুরু করেছে গ্রামের অধিকাংশ কৃষক। ইদানীং কিছু বিদেশী সবজীরও ব্যাপক ফলন হচ্ছে। অন্যান্য গ্রামের চাইতে বেশ উঁচু আর মজবুত বাঁধের জন্য বন্যার পানি কখনোই এই গ্রামকে ছুঁতে পারেনি।

গেল জৈষ্ঠ্য মাসে রেবার বিয়ের দিনক্ষণ পাকা হয়। শ্রাবণ মাসের ছয় তারিখ বাদ জুম্মা। ঝড় বাদলার দিন হলেও তেমন আমলে নেয়নি করিম মিয়া, মেয়ের ভাগ্যের উপর জোর ভরসা রেখে। এদিকে আষাঢ়ের মাঝ থেকেই নদীর পানি বাড়ার খবর গঞ্জের হাটে গিয়ে শুনে এসেছেন তিনি। ভরসা আছে এই গ্রামের উপর আর লক্ষীমন্ত মেয়ের উপরও।

দেখতে দেখতে বিয়ের দিন চলে আসল। সেইসাথে আশেপাশের গ্রামে বন্যার পানিও। পাত্র পক্ষের ওখানেও এখনো পানি উঠেনি, ছোটখাটো মফস্বল এলাকা ছিমছাম পরিপাটি। ছেলেও বিএ পাস, নিজের একটা ফার্নিচারের দোকান আছে। করিম মিয়ার হবু বেয়াই কাশেম আলীকে এলাকার সবাই খুব মান্য করে। কোন বিপদ দেখলে তিনি নিজেকে বিরত রাখতে পারেন না তা থেকে।

কোনরকম ঝক্কিঝামেলা ছাড়াই খুব অনাড়ম্বর ভাবে অল্পকিছু লোকজন নিয়ে বিয়ের কাজ সম্পন্ন হয়ে যায়। খাওয়া দাওয়ার পাট চুকে, এলো বিদায়ের পালা। চোখের জলে ভেসে, সবাইকে ভাসিয়ে দিয়ে সুন্দর জীবনের এক বুক আশা নিয়ে রেবা শ্বশুরবাড়ির পথ ধরে। দরজায় দাঁড়িয়ে রেবার মা, মেয়ের জন্য দোয়া পড়তে থাকেন। ঐ বাড়ির সকলকে যেন মেয়েটা সুখ দিতে পারে, ওর লক্ষীভাগ্য যেন ওদেরকেও ছুঁয়ে যায়। এই ভাবতে ভাবতে চোখ মুছেন রেবার মা।

সেই বিকালবেলা থেকেই প্রতিবেশী আর নিকটাত্মীয় কয়জন মহিলাকে নিয়ে নতুন বউ ঘরে তোলার অপেক্ষা করছিল জয়নব বিবি। এরমধ্যেই খবর শুনলেন শহরের অনেক জায়গায় পানি আসতে শুরু করেছে। বউ নিয়ে স্বামী-ছেলে এখনো ঘরে ফেরেনি। কেমন জানি অস্থির অস্থির লাগছে জয়নব বিবির। মন টাও কেমন কু ডাক ডাকছে যেন! সব ঠিকঠাক আছে তো!

ঠিক সন্ধ্যা পার হতেই সবাই এসে পৌঁছাল। নতুন বউকে মিষ্টি মুখ করিয়ে একে একে প্রতিবেশীরা বিদায় নিতেই, পাড়ার অনেক রাস্তায় পানি আসার খবর পাওয়া গেল। হঠাৎ করেই জয়নব বিবির মুখটা অন্ধকার হয়ে গেল। নিজের মনেই বলে উঠলেন, নতুন বউ ঘরে উঠতে না উঠতেই এত খারাপ খবর। সামনে যে আরো কি আছে!

ভোরবেলা জয়নব বিবির গগণবিদারী চিৎকারে বাড়ির সবাই পড়িমরি করে ঘুম ছেড়ে বাইরে এসে এক গোঁড়ালি পানিতে থৈ থৈ উঠোন দেখতে পেল। কাশেম আলী কিছুটা চিন্তিত হয়ে বারান্দায় বসে পড়ল। আজ বাদে কাল বউ-ভাত হওয়ার কথা। এদিকে যাদের বাড়িঘর কিছুটা নিচু, তাদের কথা ভেবে আরো দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলেন তিনি। এদিকে দুঃখে কষ্টে বিলাপ শুরু করেছেন জয়নব বিবি, একমাত্র ছেলের কত শখ করে বৌভাত করার ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু, সব আশায় আজ পানি! এই বউ বানের পানি নিয়া তার ঘরে আসছে, সব ভাসাইতে আসছে এই বউ। শেষ পর্যন্ত এই লক্ষীছাড়া বউ কপালে জুটল তার!

আজ দুইদিন কাশেম আলীর খাওয়া ঘুম নাই। ছোটাছুটি করছেন আশেপাশের মানুষের জন্য। একটু সাহস দেয়া আর সাহায্য করার জন্য। নিজেদের বাড়ির ঘরগুলো এখনো ছোঁয়া পায়নি পানির, এই যা রক্ষা। সারাদিন আল্লাহরে ডাকতে থাকেন জয়নব বিবি। পানি যদি টানে এই আশায়। বিকেলবেলা পাড়ার দুই তিন জন ছেলে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে খবর দেয়, কাশেম আলীকে জেলা হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। তাকে সাপে কেটেছে।
জয়নব বিবির বুক মাথা চাপড়ানো কান্নার শব্দের সাথে একটা শব্দ এ বাড়ির বাতাসকে ভারী থেকে গম্ভীর, আর তা থেকে ধীরে ধীরে গুমোট করে তুলছিল, ‘কি কুক্ষণে এই অপয়া বউ ঘরে তুলছিলাম আমি’
ভোরবেলা জয়নব বিবির গগণবিদারী চিৎকারে বাড়ির সবাই পড়িমরি করে ঘুম ছেড়ে বাইরে এসে এক গোঁড়ালি পানিতে থৈ থৈ উঠোন দেখতে পেল। কাশেম আলী কিছুটা চিন্তিত হয়ে বারান্দায় বসে পড়ল। আজ বাদে কাল বউ-ভাত হওয়ার কথা। এদিকে যাদের বাড়িঘর কিছুটা নিচু, তাদের কথা ভেবে আরো দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হলেন তিনি। এদিকে দুঃখে কষ্টে বিলাপ শুরু করেছেন জয়নব বিবি, একমাত্র ছেলের কত শখ করে বৌভাত করার ইচ্ছা ছিল তার। কিন্তু, সব আশায় আজ পানি! এই বউ বানের পানি নিয়া তার ঘরে আসছে, সব ভাসাইতে আসছে এই বউ। শেষ পর্যন্ত এই লক্ষীছাড়া বউ কপালে জুটল তার!

আজ দুইদিন কাশেম আলীর খাওয়া ঘুম নাই। ছোটাছুটি করছেন আশেপাশের মানুষের জন্য। একটু সাহস দেয়া আর সাহায্য করার জন্য। নিজেদের বাড়ির ঘরগুলো এখনো ছোঁয়া পায়নি পানির, এই যা রক্ষা। সারাদিন আল্লাহরে ডাকতে থাকেন জয়নব বিবি। পানি যদি টানে এই আশায়। বিকেলবেলা পাড়ার দুই তিন জন ছেলে হাঁপাতে হাঁপাতে এসে খবর দেয়, কাশেম আলীকে জেলা হাসপাতালে নেয়া হয়েছে। তাকে সাপে কেটেছে।
জয়নব বিবির বুক মাথা চাপড়ানো কান্নার শব্দের সাথে একটা শব্দ এ বাড়ির বাতাসকে ভারী থেকে গম্ভীর, আর তা থেকে ধীরে ধীরে গুমোট করে তুলছিল, ‘কি কুক্ষণে এই অপয়া বউ ঘরে তুলছিলাম আমি!’

আপনার মন্তব্য

advertisement