বিদেশ ডেস্ক

অন্যকে জানাতে পারেন:

দাউদ ইব্রাহিম। ফাইল ছবি

ভারতের মুম্বাই এর সংগঠিত অপরাধ চক্রের প্রধান দাউদ ইব্রাহিম। তিনি সংগঠিত অপরাধের জন্য ইন্টারপোলের মোস্ট ওয়ান্টেড তালিকায় এবং মার্কিন সাময়িকী ফোর্বস-এর বিশ্বের শীর্ষ পলাতক অপরাধীদের ২০১১ এর তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছেন। এখন একা হাঁটারও ক্ষমতা নেই দাউদের। ৭ বছর হল অবসর নিয়েছেন ভারতের মোস্ট ওয়ান্টেড দাউদ ইব্রাহিম। সন্ত্রাসবাদ আইনে দেশবিরোধী কার্যকলাপ রোধে ভারতের পর এবার তাঁর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করল ব্রিটেন সরকার।

মুম্বই হামলার এই ‘মাস্টারমাইন্ড ডন’-এর লন্ডন-সহ ব্রিটেনের একাধিক জায়গায় প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি ছিল। সেই সব স্থায়ী, অস্থায়ী সম্পত্তির দখল নিল ব্রিটেন প্রশাসন। ২০১৫ সালে ভারতের তরফে দাউদ সংক্রান্ত যাবতীয় নথি তুলে দেওয়া হয়েছিল লন্ডনের হাতে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও সে দেশে সফরের সময় তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনের কাছে দাউদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে তাঁর বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ করার জন্য আবেদন করেছিলেন। সেদিক থেকে লন্ডনের এই সিদ্ধান্ত ভারতকেও অনেকটাই স্বস্তি দিল। একইসঙ্গে পাকিস্তানে পলাতক মুম্বইয়ের একসময়ের কুখ্যাত ডনের বিদেশের বাণিজ্যেও ধাক্কা দিতে পারা গেল।

ফোর্বসের প্রকাশিত একটি রিপোর্ট অনুযায়ী, বিশ্বের কুখ্যাত গ্যাংস্টারদের মধ্যে অন্যতম ধনী ব্যক্তি দাউদ ইব্রাহিম। আমেরিকা, ব্রিটেন, আফ্রিকা, দক্ষিণ এশিয়া, ইউরোপ জুড়ে দাউদের ব্যবসা-সম্পত্তি ছড়ানো রয়েছে। মাদক পাচার, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবসা, হিরের খনি-সহ একাধিক ব্যবসা রয়েছে ১৯৯৩ সালে মুম্বইয়ে ধারাবাহিক বিস্ফোরণের এই মূলচক্রীর। বিভিন্ন দেশে অন্তত ৫০টি বাণিজ্যক্ষেত্রে তাঁর বিপুল বিনিয়োগ করা রয়েছে। তারই মধ্যে থেকে লন্ডনের বিভিন্ন অভিজাত এলাকায় দাউদের প্রচুর বিলাসবহুল বাড়ি, হোটেল, ফার্ম হাউস বাজেয়াপ্ত করল ব্রিটিশ সরকার।

বর্তমানে দাউদের ঠিকানা পাকিস্তানের করাচির ৩০ নম্বর রাস্তার ৩৭ নম্বর ডিফেন্স হাউজিং অথোরিটি। বিশাল সেই বাড়িটি পাকিস্তানের ‘হোয়াইট হাউস’ নামেই পরিচিত। দাউদকে ভারতে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বহুবার ইসলামাবাদকে চাপ দিয়েছে নয়াদিল্লি। কিন্তু প্রতিবারই ভারতের প্রতিবেশী দেশটি জানায়, দাউদ সে দেশে নেই। যদিও একাধিকবার দাউদের করাচির বাড়িতে ফোনে আড়ি পেতে তাঁর গলার স্বর শুনতে পেয়েছেন ভারতের তদন্তকারী অফিসাররা। ব্রিটেন দাউদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করায় তাঁর বিশাল সাম্রাজ্যের কিছুটা লোকসান হল বলেই দাবি তাঁদের।

এদিকে, জানা গিয়েছে আমেরিকায় দাউদের মোট ৪৫ কোটির সম্পত্তি আছে। অন্যান্য দেশের সম্পত্তির তুলনায় যা অত্যন্ত কম। দুবাই, সৌদি আরব-সহ পশ্চিম এশিয়ার দেশগুলিতেও দাউদের নির্দেশে প্রচুর অবৈধ ব্যবসা চলে। ইদানীং অসুস্থতার কারণে নিজে সব দেখতে না পারলেও ঘনিষ্ঠ অনুচরদের সাহায্যে ব্যবসা চালায় ও নানাভাবে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে মদত দেয়। ১৯৯৩ সালে বাণিজ্যনগরীতে ধারাবাহিক বিস্ফোরণে নিহত হন ২৭০ জন। গুরুতর জখম হয়েছিলেন সাতশোরও বেশি মানুষ। আইএস, আল কায়েদা জঙ্গিগোষ্ঠীর মতোই দাউদকেও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী হিসাবে চিহ্নিত করে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ।

জাতিসংঘের বিভিন্ন সভায় সন্ত্রাস দমনে একজোটে আমেরিকা, ব্রিটেন, ভারত কাজ করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে। সেই দিক থেকে ব্রিটিশ সরকারের এই পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর ফলে ভারত ও ব্রিটেনের মধ্যে কূটনৈতিক ও পারস্পরিক সম্পর্ক আরও মজবুত হল। দাউদের বিরুদ্ধে ব্রিটেনের এই ব্যবস্থা গ্রহণ কার্যত ভারতের বিদেশমন্ত্রকের বড় সাফল্য বলেই মনে করছে নয়াদিল্লি।

উল্লেখ্য, ১৯৫৫ সালে মুম্বাইয়ের ডংরি এলাকায় জন্ম, বাবা ইব্রাহিম কসকর ছিলেন অত্যন্ত সৎ ও নিষ্ঠাবান একজন পুলিশ কনস্টেবল। ভীষণ ধর্মভীরুও ছিলেন তিনি, নবী দাউদ (আ:) এর নামে ছেলের নাম রেখেছিলেন তিনি, ভেবেছিলেন ছেলে বিখ্যাত কেউ হবে। সেটা দাউদ হয়েছে, নিজের অপরাধমূলক কাণ্ডকীর্তিতে জগদ্বিখ্যাত নয়, কুখ্যাতই হয়েছে সে। পুলিশ বাবার ঘরে জন্ম নিয়ে অপরাধ জগতের হোতা বনে যাওয়া- সিনেমাকে হার মানিয়ে দেয়া চিত্রনাট্য দাউদের জীবনের!

‘ব্ল্যাক ফ্রাইডে'(২০০৪), ‘ডি'(২০০৫), ‘শুটআওট অ্যাট লোখান্ডওয়ালা'(২০০৭), ‘ওয়ান্স আপন এ টাইম ইন মুম্বাই'(২০১০), ‘শুটআউট অ্যাট ওয়াদালা'(২০১৩) ইত্যাদি চলচ্চিত্র নির্মিত হয়েছে দাউদের ঘটনাবলী নিয়ে। ভারত-পাকিস্তানে অনেক ভক্তও আছে তার। তবে সবকিছু ছাপিয়ে দাউদ ইব্রাহিম এক ঘৃণ্য খুনীর নাম, যার হাতে লেগে আছে শত শত নিরপরাধ মানুষের রক্ত!

আপনার মন্তব্য

advertisement

advertisement